1. admin@assistbangladesh.org : admin :
  • 01713-077667
  • assistbangladesh@gmail.com

ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি যৌতুক প্রথা

আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নানা সমস্যার অন্যতম হচ্ছে যৌতুক প্রথা। বাংলাদেশের সকল সমাজেই কমবেশি যৌতুক প্রথা প্রচলিত আছে। একটা সময় এটি নিদিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও কালের বিবর্তনে তা সব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে -যা বর্তমানে একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সমাজের মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আজ এটি একটি অভিশাপ। আজকাল যৌতুক ছাড়া কোন বিয়ে-সাদি হয় না বললেই চলে, যা যুগের পরিবর্তনে একটি ফ্যসনে রূপ নিয়েছে। যৌতুক যেন সমাজের ছেলেরা অধিকারের মধ্যেই ধরে নিয়েছে। মুসলিম প্রধান দেশ আমাদের বাংলাদেশ। ইসলাম ধর্মে যৌতুক নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশের মুসলিম পরিবারে যৌতুক প্রথার ব্যাপকভাবে প্রচলন রয়েছে। শুধু মুসলিম পরিবারে নয় সকল ধর্ম-বর্ণের পরিবারেও এ প্রথা প্রচলিত। এদেশের বিবাহ সংক্রান্ত আইনেও যৌতুক আদান-প্রদান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবু্ও অধিকাংশ বিয়েতে বরপক্ষ কনেপক্ষের কাছে যৌতুকের দাবি-দাওয়া করে এবং তা গ্রহণ করে থাকে। বাংলাপিডিয়ার মতে, বিয়েতে বর বা কণে বিপরীত পক্ষের নিকট যে অর্থ বা সম্পত্তির দাবি ও গ্রহণ করে থাকে তাকেই যৌতুক হিসেবে অভিহিত করা হয়। এদেশে যৌতুক হচ্ছে বিয়ের সময় বরকে অর্থ,সম্পত্তি কিংবা নানা ধরণের আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম দেওয়া। বর্তমানে এটি সমাজের গভীরে বাসা বেধে একটি কুপ্রথায় পরিণত হয়েছে।

যৌতুকের পিছনে রয়েছে নানা কারণ তন্মেধ্যে দারিদ্রতাই যৌতুকের প্রধান কারণ হিসাবে বিবেচিত করা হয়। দারিদ্রের কারণেই বরপক্ষ কনেপক্ষের কাছে অর্থ-সম্পদের দাবি-দাওয়া করে থাকে। তাছাড়া, এখন বহু সচ্ছল পরিবার কণে পক্ষের কাছে যৌতুকের দাবি করে থাকে এবং আজকাল কার শিক্ষিত সচেতন নাগরিকও যৌতুক দিচ্ছেন এবং নিচ্ছেন । তার কারণ তাদের মানসিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে এ কুপ্রথার প্রভাব ব্যাপক আকারে জাল বিস্তার করেছে। তাছাড়াও আমাদের সমাজের ছেলেরা কণের পিতার অর্থ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চায়। এদেশের অধিকাংশ নারী গৃহকর্মে কর্মস্থল থেকে পরনির্ভরশীল হয়ে স্বামীর সংসারে জীবন যাপন করে। ফলে কনেপক্ষ বরপক্ষকে যৌতুক প্রদান করে। এছাড়াও অনেকে, শ্বশুর বাড়িতে মেয়ের সুখের জন্য এবং মেয়ে যাতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে সেজন্যও যৌতুক প্রথা সমাজে ব্যাপক ভাবে বিস্তার লাভ করছে।

যৌতুকের কারণে সমাজে এর নানা ভয়ংকর প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে। যৌতুকের কারণে নিত্যনিয়ত দাম্পত্য কলহ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং স্ত্রী হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। বিবাহিত নারীর প্রতি অত্যাচার ও সংহিতার মূল কারণ যৌতুক। যৌতুকের কারণে মেয়েকে শ্বশুর বাড়িতে অকথ্য নিগ্রহ ও নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়। যৌতুকের দাবি-দাওয়া পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় আজ অধিকাংশ দাম্পত্য জীবনে কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্টে উঠে এসেছে, দেশের ৮৭ ভাগ মেয়ে পারিবারিক নিগ্রহ ও নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে যার সিংহভাগ শুধুমাত্র যৌতুকের কারণে। এছাড়াও নারী অধিকার সংরক্ষণের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৮ সালেই যৌতুকের কারণে ১০২ জন নারীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং আত্মহত্যার স্বীকার হয় ৪ জন। যৌতুকের কারণেই মূলত বাল্যবিবাহের হার দিনদিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। মেয়ের বয়স কম হলে যৌতুক কম দিতে হয় আর বয়স বেশি হলে যৌতুক বেশি দিতে হয় এমন একটি কুপ্রথার ধারণা নিয়েও অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে বাল্যবিবাহ বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়াও যৌতুকের দাবি মিটাতে অনেক দারিদ্র্য পরিবার যেখানে তিনবেলা ঠিকমতো ভাত জোটে না সেখানে শুধুমাত্র মেয়ের নির্যাতনের মাত্রা হ্রাস এবং সুখের জন্য মোটা অঙ্কের সুদে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ছে কেউবা বেঁচে থাকার অবলম্বন ভিটে-মাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

যৌতুক একটি দন্ডনীয় অপরাধ। আমাদের দেশে যৌতুক বন্ধে ১৯৮০ সালে যৌতুক নিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়। এ আইন অনুযায়ী যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ করলে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদন্ড বা পাঁচ হাজার টাকা অর্থদন্ড হতে পারে। ১৯৮৬ সালে এ আইন সংশোধিত করে বলা হয়েছে, কেউ যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ করলে সর্বনিম্ন ১ বছর এবং সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদন্ড হতে পারে। ১৯৮৩ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিধান অনুযায়ী যৌতুকের কারণে নারীর মৃত্যু ঘটলে বা ঘটানোর চেষ্টা চালালে অপরাধীকে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হবে। এত কঠিন আইন থাকা সত্ত্বেও উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে যৌতুক প্রথার বিস্তার। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, বাংলাদেশে যদিও ভয়ংকর আইনের বিধান রয়েছে কিন্তু এ আইনের তোয়াক্কা করে না কেউ। কেননা, আইনের যতেষ্ঠ ফাঁক-ফোকড় রয়েছে। যৌতুকের কারণে খুব বেশি মামলা হয় না। যাও হয় তার ৯০ শতাংশ বিচার পায় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দীর্ঘসূত্রতিকার কারণে যৌতুক প্রথা লাগামহীন ভাবে ছুটে চলেছে।

যৌতুক প্রথা বাংলাদেশের পরিবার ও সমাজ জীবনে ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এ প্রথার কুফল হতে মুক্ত হতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। যৌতুক প্রতিরোধ করার জন্য প্রথমেই সচেতন করতে হবে পরিবারকে, একই সঙ্গে আমাদের প্রতিবেশী এবং পাড়া-মহল্লা-গ্রামের মানুষকে । বোঝাতে হবে যৌতুকের ভযংকর কুফল। পরিবারের কন্যা সন্তানসহ সবাইকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। মেয়েদের কে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে হবে, তাহলে যৌতুকের অভিশাপ তাদের স্পর্শ করতে পারবে না । “যৌতুক দেব না, যৌতুক নেব না” এই স্লোগানে যৌতুকবিরোধি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যৌতুকের কারণে নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে এলাকার শিক্ষিত, সচেতন এবং তরুণসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি এলাকায় যৌতুকবিরোধী একটি করে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম সহ সভা, পদযাত্রা এবং ব্যালির মাধ্যমে জনগণ কে সচেতন করতে হবে। যৌতুক নিরোধে আইনগুলো বাস্তবায়নে আইনের সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে ক্রুটি দূর করতে হবে। একইসঙ্গে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নারীর প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, সম্মান দেখানোর শিক্ষা এবং নারীর প্রতি সহানুভূতি সম্পর্কে পাঠ্যবিষয়ে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। এই কুপ্রথা প্রতিরোধ করতে সবাই এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের সব মানুষের মাঝে সৃষ্টি করতে হবে যৌতুকবিরোধী মনোভাব ও সচেতনা। আমাদের চেতনা, মানসিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখতে হবে- নারীর ক্ষমতায়ন, বাল্যবিবাহ বন্ধ এবং নারীর সম্মানজনক অবস্থায় ফিরতে এই কুপ্রথা বন্ধ করতেই হবে। তবেই যৌতুকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পাবে আমাদের সমাজ।

লেখক:
মোহম্মদ শাহিন
শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: alommdshahin688@gmail.com

Please follow and like us: