1. admin@assistbangladesh.org : admin :
  • 01713-077667
  • assistbangladesh@gmail.com

রাজা যায়, রাজা আসে; ইতিহাস হাসে

২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, ‘তুমি সব মানুষকে কিছুদিনের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারবে বা কিছু মানুষকে সব সময়ের জন্য, কিন্তু সবাইকে সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারবে না।’ এটি ইতিহাসের অমোঘ সত্য। এ বছর পলাশী দিবস সবচেয়ে বেশি তাত্পর্য বহন করে—পলাশী যুদ্ধের ২৬৩ বছর পরে চক্রান্তকারী; কূটকৌশলী বাংলা তথা পুরো ভারতবর্ষের স্বাধীনতা হরণকারী—ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক ভারতীয় নাগরিকদের সাথে প্রতারণা, সম্পদ লুন্ঠন ও অর্থ আত্মসাতের ঘোরতর অভিযোগ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্র হোয়াইট হলের ডাইনিং স্ট্রিটের পেছনে এবং তাঁর জন্ম শহর পশ্চিম ইংল্যান্ডের শ্রসবেরি থেকে রবার্ট ক্লাইভের মূর্তি সরিয়ে ফেলার আন্দোলন জোড়ালো হয়ে উঠেছে। অনেক আবেদনপত্র খোলা হয়েছে চেঞ্জ-ডট-অর্গ ওয়েব সাইটে। সাম্যবাদী মহামারী করোনার কারণে মানুষ এখন মানুষের জীবনের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করতে শিখেছে।

সাম্প্রতিক আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পর ‘ব্লাক লাইভ ম্যাটারস’ বর্ণবাদ বিরোধী জোড়ালো আন্দোলন এখন সমস্ত ইউরোপের মানুষদের মনের পালে হাওয়া লাগিয়েছে। পুরো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়া এই বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন সঠিকভাবেই বর্ণবাদের মূল হিসেবে ঔপনিবেশিকতাকে শনাক্ত করতে পেরেছে। এবং ঔপনিবেশিক নায়কদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থল করেছে। বর্ণবাদ, শ্রেণিশোষণ, জোড় করে ভূখন্ড দখল; লুন্ঠন; ঔপনিবেশিক শোষণের ইতিহাসকে খোদ মহা সাম্রাজ্যশালী বৃটেনের জনগণ এখন প্রত্যাখান করতে শুরু করেছে। তামাম ইউরোপ জুড়ে এখন ঔপনিবেশ স্থাপনে ভূমিকা রাখা সেনাপতি; বর্ণবাদ ছড়ানো শাসক; দাস ব্যবসার সর্দারদের বড়ো বড়ো মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা; সরানো ও জাতীয়ভাবে দেয়া বিভিন্ন খেতাব সমূহ প্রত্যাখান করার আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছে।

প্রবাদ আছে—ধর্মের কল আপনা নড়ে; এবার ধর্মের কল করোনা বাতাসে নড়ে উঠেছে। বর্ণবাদ বিস্তারকারী নেতা চার্চিলের, অস্ট্রেলিয়া দখলকারী ক্যাপ্টেন জেমস কুক, ক্যালিফোর্নিয়ায় ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনকারী জলদস্যু ফ্রান্সিস ড্রেকের মতো বিতর্কিত ও কুখ্যাত ব্যক্তিদের মূর্তি অপসারণ করার দাবি উঠেছে। ভারতবর্ষে দুইশত বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের ভীত রচনাকারী সেই হঠকারী ও ধুরন্ধর রর্বাট ক্লাইভের বিরুদ্ধে—চক্রান্তকারী, হাজার হাজার ভারতীয় জনগণকে খুন ও সম্পদ লুণ্ঠনের ঘোরতর অভিযোগ উত্থাপন করেছে তার দেশের নাগরিক স্বজনেরাই।

কোম্পানি ভারতে আসার পূর্বে বিশ্ব অর্থনীতির ২৩ শতাংশ হিস্যা ছিলো ভারতের, যা ঐ সময়ের ইউরোপের সব দেশের অর্থনীতির যোগফলের সমান। যখন ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত থেকে চলে যায়, তখন কমে মাত্র ৩ শতাংশে নেমে আসে। ব্রিটিশ অর্থনীতি গড়ে উঠেছিলো ভারতবর্ষ থেকে লুট করা সম্পদ দিয়েই। পলাশীর যুদ্ধের পর ক্লাইভ বিলেত ফিরে গিয়ে ভারত থেকে লুট করে নিয়ে যাওয়া অর্থে বিপুল সম্পত্তি ও আভিজাত্য কেনেন। এক হিসাব অনুযায়ী, ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫ পর্যন্ত দুবারে ক্লাইভ বাংলা থেকে প্রায় তিন মিলিয়ন পাউন্ড (বর্তমান হিসাবে ৩০ কোটি পাউন্ড) বাগিয়ে নেন। কথিত আছে—ক্লাইভের স¿ীর পোষা এক নকুলের গলায় নাকি বর্তমান মূল্যে ২৬ লাখ টাকা মূল্যের একটি হীরার হার ঝুলত।

সাম্রাজ্যচ্যুত মোগল নবাব শাহ আলম ১৭৬৫ সালে ক্লাইভের চক্রান্তে ও চাপে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলায় দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার দিতে বাধ্য হন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে বাংলার নবাবের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় রাজস্ব আদায়ের নামে বাংলায় যে লুটপাট ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তারফলে বড় দুর্ভিক্ষ ১১৭৬ বাংলা সনের বা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ দেখা দেয়। পঞ্চাশের মন্বন্তরের আগে বাংলায় সবচেয়ে এটি বড় দুর্ভিক্ষ। এক গবেষণায় অমর্ত্য সেন একে ‘মনুষ্য-সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ’ বলে অভিহিত করেছেন। ১৭৬৯-৭৩ সালের এই দুর্ভিক্ষে বাংলায় প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যায়। কিন্তু এই দুর্ভিক্ষের সময়ও বাংলা থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আগের চেয়ে বৃদ্ধি পায়! যখন দুর্ভিক্ষ পীড়িত এলাকায় না খেতে পেয়ে প্রতি তিনজনের একজন মানুষ মারা যাচ্ছে, তখন কোম্পানি তাদের সৈন্যবাহিনীর জন্য প্রচুর খাদ্যশস্য মজুত করছিল। কোম্পানির কর্মচারীরা চালের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ কামিয়ে বিলেতে পাঠান।

দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে খারাপ সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা ১০ লক্ষাধিক পাউন্ড লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর অষ্টম শতকের অর্থনৈতিক মন্দার সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে ব্রিটিশ সরকার ১৪ লাখ পাউন্ড ঋণ দেয়। বিপর্যয়ের মুখে পড়া কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে সরকারি অর্থ প্রদান করে ‘বেইল আউট’ করার এটি সম্ভবত বিশ্বে প্রথম ঘটনা। ব্রিটিশ সরকারকে এটি করতে হয় কারণ তখন বাংলার রাজস্বের ওপরই ব্রিটিশ সমৃদ্ধি নির্ভর করছিল। সেই সময়ের একজন ব্রিটিশ সাংসদ পার্লামেন্টে বলেছিলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে রক্ষা করা অপরিহার্য, তা না হলে গ্রেট ব্রিটেন ধ্বংস হয়ে যাবে! ক্লাইভের পাশাপাশি তত্কালে ব্রিটিশ প্রধানমন্¿ী চার্চিলও অভিযুক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪৩ সালে বাংলায় (পঞ্চাশের মন্বন্তর) এবং দুর্ভিক্ষ পরবর্তী মহামারিতে ৩৫ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ মারা যায়। এই দুর্ভিক্ষের সময় চার্চিল দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলায় খাদ্য সরবরাহের পরিবর্তে ভারতের চাল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য পাঠান এবং গ্রিস এবং অন্যান্য জায়গায় ইউরোপিয়ানদের জন্য বিপুল মজুত গড়ে তোলেন। চার্চিল বলতেন যে আধপেটা বাঙালির জন্য দুর্ভিক্ষ তেমন কিছু নয়। এই নেতা দুর্ভিক্ষের জন্য বাঙালিদেরই দায়ী করে বলেন ভারতের মানুষ ‘খরগোশের মতো গাদা গাদা বাচ্চা পয়দা করে’ বলেই দুর্ভিক্ষ হয়েছে। ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ এই ব্রিটেনের মূর্তি এখন পুলিশ পাহারায় রাখতে হচ্ছে। তাঁর নাতনি প্রস্তাব দিয়েছেন মূর্তিটিকে জাদুঘরে তুলে রাখার।

রবার্ট ক্লাইভ যখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির গভনর্র তখন খোদ ইংল্যান্ডেই তাঁর নাম পড়েছিল ‘লর্ড শকুনি’ (লর্ড ভালচার)। তাঁর এই নাম হয়েছিলো—নির্লজ্জ অর্থ আত্মসাত্ ও ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’-এর ভূমিকার জন্য। গেল বছর বিখ্যাত লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল প্রকাশিত তাঁর বই ‘দ্য অ্যানার্কি’তে তিনি ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন, ষড়যন্¿, বেইমানি, সমৃদ্ধি ও অবাধ লুণ্ঠনের বর্ণনা দিয়েছেন। এই লেখকও লন্ডনের হোয়াইট হল সড়ক থেকে ‘লর্ড শকুনি’ রবার্ট ক্লাইভের মূর্তি অপসারণ করার দাবি জানিয়েছেন।

তত্কালে বিজয়ী ক্লাইভ এখন নিজভূমে দোষী সাব্যস্ত নিজ উত্তরাধিকারদের দ্বারা। জন্মভূমির মানুষ বলছে—‘ক্লাইভ অব ইন্ডিয়া ইজ দ্যা সিম্বল অব কলোনিজম’ এক সময়ে তার সম্মানে দেয়া ‘ক্লাইভ অব ইন্ডিয়া উপাধী প্রত্যাখান করে নেওয়ার পিটিশনে হাজার হাজার নাগরিক স্বাক্ষর করেছে। প্রসাদ ষড়যন্¿; কূটচক্রান্ত করে সাময়িক বিজয় অর্জন করে বীর বনে যাওয়া যায় কিন্তু ইতিহাস একসময় ঠিকই ঘুরে আসে। ইতিহাস হতে কেউ শিক্ষা না নিলেও ইতিহাস কাউকে ছেড়ে দেয় না। বাংলা; বিহার উড়িষ্যার নবাব সিরাজ পরাজিত হয়েও দেশপ্রেমিক শাসক হিসেবে ইতিহাসে বেঁচে আছেন সগৌরবে। অপরদিকে হঠকারী ও ঘুষ উেকাচ গ্রহণকারী ক্লাইভ আজ নিজ ঘরে অপাঙক্তেয়। নিজ নাগরিক আজ তাঁর অপকর্মের দায় কাঁধে নিতে চায় না তারা ইতিহাসের এই কালপিটকে তাঁর মূর্তিকে ছুড়ে ফেলে প্রত্যক্ষভাবে রবার্ট ক্লাইভকে জাতীয় ভাবে বয়কট করে ভারতবর্ষের তথা বাংলার মানুষের কাছে ঋণের দায় কিছুটা কমাতে চায়। গোটা বৃটেন এমন কি পুরো ইউরোপের তরুণদের সাধুবাদ না জানিয়ে থাকা যায় না। লুটতরাজ ক্লাইভ আজ অত্যাচার, লুণ্ঠন ও হাজার হাজার ভারতীয় খুনের দায়ে নিজভূমে কাটগড়ায়। বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনসূর্য অস্তগিয়েছিলো এই চক্রান্তকারীর জন্যে। শুধু বাংলা নয় পুরো ভারতবর্ষে জেঁকে বসেছিলো দুশো বছরের পরাধীনতার জগদ্দল ইংরেজ শাসন। একজন দেশপ্রেমী স্বাধীন নবাব হিসেবে সিরাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দোসরদের অন্যায় আবদার মেনে নেননি। বিনামাশুলে ব্যবসা; কুটি স্থাপন; নবাবের পূর্বানুমতি না নিয়ে জমি কিনে শহর-কলকাতার পত্তন এ বিষয়গুলো না মানা সত্যিই একজন ন্যায়নিষ্ঠ শাসকের স্বভাব। ক্লাইভের অন্যায় দাবী না মেনে পলাশীর অভিনয়ে পরাজিত হলেও স্বাধীন বাংলার নবাব সিরাজ আজীবন জয়ীর আসনে চির সমুন্নত।

রচনাকাল: জুন ১৮, ২০২০। শ্যামলী, ঢাকা।

 

 

লেখক:
ইমরুল কায়েস
গল্পকার ও সরকারি কর্মকর্তা
ইমেইল: ikayesnbr@yahoo.com

Please follow and like us: