1. admin@assistbangladesh.org : admin :
  • 01713-077667
  • assistbangladesh@gmail.com

প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা, দ্রুত সমাধান চাই

জুহিত জান্নাত:
দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার প্রায় শতভাগ। যদিও এসব শিক্ষার্থীর পাঠদানে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না পর্যাপ্ত শিক্ষক। গড়ে তোলা হচ্ছে না প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ফলে প্রাথমিকের গণ্ডি না পেরোতেই শিশুদের বড় একটি অংশ ঝরে পড়ছে। সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বেহাল দশা দেখার কেউ নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক স্বল্পতায় শিক্ষা কার্যত্রম চলছে ধীরগতিতে। দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক সংকটে শিক্ষা কার্যক্রমে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা অপরদিকে শ্রেনিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা, খেলাধূলা সহ প্রাথমিক স্তরের রুটিন কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের।

জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে অপরিহার্য স্তম্ভ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। কিন্তু সারা দেশের চলমান চরম শিক্ষক সংকট উন্নয়ন ও শিশুদের ভবিষ্যৎ গঠনের পথে প্রধান অন্তরায়। সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চলমান শিক্ষক সংকটের কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো:

কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায় অবস্থিত ৬২ নং নিদান তরানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় । এখানে ছাত্র ছাত্রী রয়েছে ৫ শতেরও অধিক। শিক্ষক রয়েছে ৩ জন। প্রধান শিক্ষক নেই, একজন সহকারী শিক্ষিকা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে ফাঁকা রয়ে গেছে ২ জন শিক্ষকের পদ।

নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার এনায়েতপুরে অবস্থিত এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষকের পদ রয়েছে ৭ টি। বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩ জন শিক্ষক যার মধ্যে ১ জন ভারপ্রাপ্ত নারী প্রধান শিক্ষিকা ও বাকি ২ জন সহকারী শিক্ষক, শিক্ষিকা। ফলে ফাঁকা রয়ে গেছে আরও ৪ টি শূন্যপদ। বিদ্যালয়টির মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ১০৪ জন।

পটুয়াখালী জেলার দুমকি উপজেলায় পাঙ্গাংশিয়া ইউনিয়নে ৯ নং পাংঙ্গাশিয়া মুস্তাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ রয়েছে মোট ৬ টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন ১ জন প্রধান শিক্ষক ও ২ জন সহকারী শিক্ষক। বাকি ৩ টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়ে গেছে। যার মধ্যে একজন সহকারী শিক্ষক যিনি পিটিআই প্রশিক্ষণে আছেন বাকি ১ জন নারী সহকারী শিক্ষিকা আছেন তিনিও মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে চলে যাওয়ার কথা থাকলেও এখনও বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ফলে মাত্র একজন সহকারী শিক্ষিকা দিয়ে বিদ্যালয়ের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে ।

কুমিল্লা জেলার অধীন মেঘনা উপজেলার ৩৫ নং বাঘাইকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের পদ রয়েছে ৬টি। কিন্তু বিদ্যালয়ে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন সহকারী শিক্ষক। ফাঁকা রয়ে গেছে ৪ জন শিক্ষকের পদ। এই ২ জন শিক্ষকেই চলছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ও অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্ব।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন রয়েছে তার মধ্যে ৬ টি ইউনিয়ন দূর্গম চরাঞ্চলে। চরাঞ্চলে প্রায় ১২০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। চর আদিত্যপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের পদ আছে ৬টি কিন্তু কর্মরত শিক্ষক আছেন মাত্র ৩ জন। শুধু এই চরআদিত্য স্কুলই না, বরং কাজিপুর উপজেলার চরাঞ্চলের প্রত্যেকটা স্কুলে ২টি, ৩টি এমনকি ৪ টি পর্যন্ত পদ ফাঁকা আছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন অ্যানুয়াল সেক্টর পারফরম্যান্স রিপোর্ট ২০১৯’-এর তথ্য বলছে, মাত্র একজন শিক্ষকেই চলছে দেশের ৭৪৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। ২ জন শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ১২৪টি। আর ৩ জন শিক্ষকে পরিচালিত বিদ্যালয় রয়েছে ৪ হাজার ৮টি।

শূন্যপদ পূরনের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এ পরীক্ষায় রেকর্ড সংখ্যক ২৪ লক্ষ পরীক্ষার্থী আবেদন করেন যার মধ্যে থেকে ৫৫,২৯৫ জন (২.৩%) পরীক্ষার্থী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় । অধিক পরিমাণে শূন্যপদ থাকার সত্ত্বেও ৫৫,২৯৫ জন থেকে মাত্র ১৮১৪৭ জন পরীক্ষার্থীকে চূড়ান্ত ভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। বাকি ৩৭ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী নিয়োগ বঞ্চিত হন। প্রাথমিকে রীট জটিলতার কারণে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বন্ধ ছিল দীর্ঘ ৪ বছর। ফলে অনেক পরীক্ষার্থীর এটি ছিল শেষ চাকরির পরীক্ষা । তাছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ৮নং এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, শূন্যপদ পূরনের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চূড়ান্ত নিয়োগে সম্পূর্ণ শূন্যপদ পূরণ না করেই পদায়ন কার্যক্রম সম্পূর্ণ করা হয় যেটি ছিল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক ।

নড়াইল-১ আসনে ৪১ জন শিক্ষককে পদায়ন করার পরও ৩০ অধিক শূন্যপদ রয়ে গেছে। ঠাকুরগাঁও-২ এর বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা ৮৭ জন শিক্ষককে পদায়ন করার পর ফাঁকা থেকে যায় বেশ কিছু পদ। এছাড়া বরগুনা-২ আসনে এ ২১৪ জন, নীলফামারী-৩ আসনে ৯০ জন, ঝিনাইদহ-৩ আসনের (মহেশপুর-কোটচাঁদাপুর) উপজেলায় ৭৭ জন ও টাঙ্গাইল-৮ আসনে (বাসাইল-সখীপুর) ৮৯ জন শিক্ষকে পদায়ন করার পরও অধিক সংখ্যক শূন্যপদ খালি রয়ে গেছে।

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় সহকারী শিক্ষকের দুই লাখ ৯০ হাজার ৬০০ পদের মধ্যে দুই লাখ ৪৭ হাজার শিক্ষক কর্মরত আছেন। সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা ৪৩ হাজার ৬০০টি। এ হিসাব গত ১৪ জুন পর্যন্ত। প্রধান শিক্ষকেরও প্রায় ২০ হাজার পদ খালি রয়েছে। এর মধ্যে পুরনো সরকারি বিদ্যালয়ে ছয় হাজার এবং ২০১৩ সালে সরকারীকরণ হওয়া প্রায় ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৪-১৫ হাজার বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ সহকারী শিক্ষকের মধ্য থেকে পদোন্নতি এবং ৩৫ শতাংশ নতুন করে পরীক্ষা নিয়ে পূরণ করা হয়। এছাড়াও প্রতিদিন ২০০ জন শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন। তার বিপরীতে নিয়মিত নিয়োগ হচ্ছে না। ফলে থেকেই যাচ্ছে শিক্ষক সংকট।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলমান শিক্ষক সংকট নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও দ্রুত দূর করা সম্ভব নয়। একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভাবে পদায়ন করতে প্রয়োজন ২ বছরেরও অধিক সময়। তাই দ্রুত শিক্ষক সংকট দূর করতে প্যানেল নিয়ম প্রবর্তন করে নিয়োগ দেওয়াই হবে উপযুক্ত ও সময়পযোগী সিদ্ধান্ত। কারণ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০১৮ চূড়ান্ত ভাবে সুপারিশ প্রাপ্ত না হওয়া লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৩৭ হাজার প্যানেল প্রত্যাশী সর্বোচ্চ ২৪ লক্ষ পরীক্ষার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাদের কোয়ালিটি দেখিয়ে দিয়েছে।

প্রাথমিকে প্যানেল নিয়ম প্রবর্তনে একাত্বতা প্রকাশ করেছেন নড়াইল-১ এর মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব কবিরুল হক (মুক্তি), ঠাকুরগাঁও-২ এর মাননীয় সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আলহাজ্ব মো: দবিরুল ইসলাম এম. পি, নীলফামারী-৩ ও ঝিনাইদহ-৩ এর মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব রানা মোহাম্মদ সোহেল ও এ্যাড. শফিকুল আজম খান এম. পি, বরগুনা-২ এর মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব শওকত হাচানুর রহমান ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও টাঙ্গাইল-৮ এর ( বাসাইল-সখীপুর) মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব এ্যাড. জোয়াহেরুল ইসলাম এম. পি।

এছাড়াও প্রাথমিকে প্যানেলে নিয়োগের ব্যাপারে সমর্থন দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদের সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক জনাব আনিসুর রহমান, শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু ও অন্যান্য শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ।

তাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মানবতার মা জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট বিনীত আবেদন, সরকারের ভিশন-২০২১ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন, সারা দেশে বিদ্যমান চরম শিক্ষক সংকট ও করোনা পরবর্তী সংকট মোকাবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০১৮ লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৩৭ হাজার মেধাবী পরীক্ষার্থীদের প্যানেলে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে পূরণ হবে মুজিব বর্ষে প্রতি ঘরে ঘরে একজন করে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং চরম বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে ৩৭ হাজার প্যানেল প্রত্যাশীদের ।

লেখিকা: প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০১৮ প্যানেল প্রত্যাশী, ঝালকাঠি জেলা।

Please follow and like us: