1. admin@assistbangladesh.org : admin :
  • 01713-077667
  • assistbangladesh@gmail.com

কোভিড-১৯ এর বিস্তার: আমরা কি সচেতন?

শাহাদাত আনসারী:
পৃথিবীর গতি আজ পাল্টে গেছে অতি আণুবীক্ষনিক করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর কারণে। মহামারি ভাইরাসকে দেখতে না পেলেও তার ভয়াবহতা আজ উপলব্ধি করছে বিশ্বের ছোট-বড় সকলেই। চীনে এ ভাইরাসের উৎপত্তি হয়ে ইউরোপের ফ্রান্স ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পারমানবিক ক্ষমতার অধিকারী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত যুক্তরাষ্ট্রও হার মেনেছে কোভিড-১৯ এর কাছে। লক্ষাধিক মানুষ সেখানে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। বর্তমানে আমেরিকা ও ইউরোপে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও বাংলাদেশে দিন দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সময় পেয়েও আমরা অনেকেই সচেতনতার কথা ভুলেই যাচ্ছি। ফলে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ব্যর্থ হচ্ছে।

করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ গত বছরের ডিসেম্বরে দেখা দিলেও বাংলাদেশে শনাক্ত হয় এ বছরের ৮ মার্চ। আর দেশে করোনায় প্রথম মৃত্যুবরণ করে ১৮ মার্চ। এরপর ক্রমাগত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দিনমজুর, শ্রমিক থেকে শুরু করে শিল্পপতি, শিক্ষাবিদ, ডাক্তার ও মন্ত্রী-এমপি কাউকে ছাড় দিচ্ছে না করোনা। আমরা প্রথম দিকে কিছুটা সচেন হলেও দিন দিন সাবধানতাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। অথচ বর্তমানে প্রতিদিন দেশে প্রায় ৩০০০ জন করোনায় অক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুবরণ করছে প্রায় ৪০ জন। বিভিন্ন মাধ্যমে বার বার সাবধানতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা প্রচার হলেও আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছি না। ফলে দিন দিন করোনায় আক্রান্তের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বর্তমানে দেশের সব অফিস খোলা হয়েছে। অর্থনীতির চাকা থামানো যাবে না বলে সব ব্যাংক সাধারণ নিয়মেই চালু হয়েছে। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগে সরকার যখন সব অফিস বন্ধ করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিলো এবং ব্যাংকগুলো সীমিত কার্যক্রম পরিচালনা করছিলো তখন আমরা ঈদের মতো বাড়ি ফিরতে ব্যস্ত হয়েছিলাম। যানবাহনে উপচে পড়া ভীড় দেখেও আমরা বাহিরে বের হয়েছি। তাহলে কি বলা যায় করোনা আমাদের সচেতন করতে পারেনি? আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবা তেমন উন্নত না। হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ হাতে গোনা। তারপরও যদি আমরা সচেতন না হই তবে ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আমরা প্রতিনিয়ত জানছি খুব প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বহির হওয়া যাবে না। আবার বাহিরে গেলেও মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লোবস পরে নিতে হবে। বার বার হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে হাত ধৌত করতে হবে। আমাদের সবাই প্রথম দিকে এগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই এগুলো মানতে চাচ্ছেন না। তাঁরা ভাবছেন এতোদিন যেহেতু তাদের কিছু হয়নি তাই করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ আর আক্রান্ত করতে পারবে না। কিন্তু তাদের একটু ভাবা দরকার বাংলাদেশে দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে এখন ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেই যথাসময়ে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হলে কতটুকু চিকিৎসা পাবো তা ভাবার বিষয়।

আমরা দৈনন্দিন কাজে বাহিরে বের হচ্ছি। জীবন ও জীবিকার তাগিদে বের না হয়ে পারি না। মাস্ক পরছি এবং বার বার কমপক্ষে ২০ সেকে- ধরে হাত ধৌত করছি। কিন্তু নিজের অজান্তেই অনেক সময় চোখে বা মুখে হাত দিচ্ছি। বারা বার নিজের মোবাইল ফোনটা পকেট থেকে বের করছি। নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটা বিভিন্ন ডেস্ক বা টেবিলে রাখছি আবার পকেটে নিচ্ছি। নিজের ব্যবহৃত ব্যাগটা বিভিন্ন টেবিলে রাখছি। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছি আমার মোবাইল ফোন বা ব্যাগের মাধ্যমে আমি করোনা ভাইরাসকে নিজে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি কিনা?

জীবন ও জীবিকার তাগিদে হাট-বাজার, ব্যাংক ও অন্যান্য জনসমাগমে যেতে হচ্ছে। জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সম্ভব না হলেও আমরা সচেতনতার সাথে চলাচল করতে পারি। ব্যাংক হতে প্রয়োজনে আমরা ২-৩ মাসের খরচের টাকা উত্তোলন করে নিজ বাড়িতে সঞ্চয় করতে পারি। এছাড়াও যখন ভীড় কম থাকার সম্ভবনা তখন ব্যাংকে যেতে পারি। অনেকেই নিজের কাজে ব্যাংকে গেলেও পরিবারের ছোট বাচ্চা বা সদস্যদের নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের বুঝা দরকার ব্যাংক থেকে করোনা ছড়ানোর সম্ভবনা অনেক বেশি। আবার আমরা যদি ১-২ সপ্তাহের নিত্য প্রয়োজনীয় বাজার একসাথে করতে পারি তবে নিজেরা অনেকটা নিরাপদে থাকা যায়। হাট-বাজারে অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। তাই বাজারে কম যাওয়াটাই এখন বেশি নিরাপদ।

সরকার দেশের সর্বত্র চলাচল স্বাভাবিক করতে চাচ্ছেন। এখন আমরা কতটুকু চলাচল করবো তা নির্ভর করছে নিজের উপর। প্রয়োজনে আমাদের চলাচল করতে হবে। তাই বলে আমরা যদি আগের মতো বিনা প্রয়োজনে বা একটু হাল্কা শরীরর চর্চার জন্য হাঁটাহাঁটি করি তা ঠিক হবে না। বিনোদনকেন্দ্রগুলো এখন প্রায় বন্ধ আছে। আমাদের অনেকেই নদীর ধারে বা স্থানীয় ব্রীজ চত্ত্বরে আড্ডায় সময় কাটাচ্ছেন। সামান্য প্রয়োজনে বা বিনা প্রয়োজনে অনেকে এখনও বাজারে যাচ্ছেন। একটু ভাবতে হবে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। করোনার বিদায়ে একদিন সুদিন আসবে তখন আমরা আনন্দ-বিনোদন করবো।

দৃশ্যমান শত্রুর সাথে যুদ্ধ করা যায়। থাকে জয়-পরাজয়। কিন্তু করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এক অদৃশ্য শত্রু। তার সাথে যুদ্ধ নয়। আর যুদ্ধ করতে হলেও ঢাল-তলোয়ার বা গ্রেনেড-বোমা নয় অমাদের অস্ত্র হবে ঘরে থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে সচেতন থাকা। আমাদেরকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। সাস্থ্যবিধি মেনে নিজেদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারের সচেতনতামূলক কার্যক্রম অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। ইনশাল্লাহ একদিন করোনা ভাইরাস থেকে আমরা মুক্ত হবো। অন্ধকারের অমানিশা কেটে একদিন ভোর আসবে। পৃথিবী ফিরে যাবে পূর্বের ন্যায়। অন্যের ভুল ধরা বা সমালোচনা নয় এখন সময় হয়েছে নিজেকে সংশোধন করে আরো বেশি সচেতন হওয়ার। যেদিন আলোকিত ভোর আসবে সেদিন যেন সবাই দর্শক বা সাক্ষী হতে পারি সে ভরসা রেখেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।

 

লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক।

Please follow and like us: