পরিবারের বয়স্কদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য

সৈয়দা রওশন আরা পারভীন:
আমাদের সমাজে প্রথমিক সামাজিক সংগঠন হচ্ছে পরিবার। একজন মানুষ সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার পিছনে সিংহভাগ ভূমিকা পরিবারের। পরিবারে মা বাবা তার সন্তানদের আগলে রাখেন স্নেহ, মমতা আর ভালবাসায়। জন্মের পর থেকে পরম যত্নে আদর সোহাগ দিয়ে লালন পালন করেন তার সন্তানদের। আর যখন সেই সন্তানেরা একটু হয়ে ভালমন্দ বুঝতে শিখে তখন ভাইবোনদের ভেতর মা বাবার আদর নিয়ে চলে কাড়াকাড়ি। কাকে মা বাবা বেশি ভালবাসেন তা-ই নিয়ে খুনসুটি। আর পরিনত বয়সে মা বাবা যখন বার্ধক্যের ঘরে, তখন দৃশ্যপট যায় পাল্টে। নিজের হাতে গড়ে তোলা পরিবারে মা বাবাকে বাদ দিয়েই চলে সব হিসাব নিকাশ। ঝামেলা এড়ানোর জন্য ভাই বোনেরা এ ওর ঘাড়ে তাদের দায়িত্ব চাপাতে থাকেন। আর এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে চলে মন কষাকষি। তাদের সান্নিধ্য তখন যেন আর কাম্য নয়। কখনো বা তাদের গুরুত্ব শুধু নাতি নাতনির দেখভালের জন্যই।
পরিবারের প্রধান হয়ে একদিন যিনি পরিবারকে আগলে রেখেছেন, সব দায়দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পরিবারের মঙ্গল কামনা করেছেন, বার্ধক্যে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে তিনি একাকি জীবনযাপন করেন। নিজের গড়া সাজানো পরিবারটির কর্তৃত্ব ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে যান তিনি। আস্তে আস্তে নিজের চির-চেনা পরিবারটি কেমন যেন অচেনা হয়ে যায় তার কাছে। ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে থাকে পরিবারের নিয়ম শৃঙ্খলায় এবং আচার আচরনেও। ঢিলেঢালা হতে থকে সম্পর্কগুলোর বন্ধন। আর সেই পরিবারের চেনা জীবন চেনা সংসার অচেনা হয়ে চলে যায় দূরে, বহু দূরে। মনের মধ্যে তৈরি হয় গভীর শূন্যতা। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, কিন্তু এখনকার আত্মকেন্দ্রিক সমাজে যখন পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে আসছে তখন বৃদ্ধ মা বাবা আর সন্তানের সম্পর্কের মধ্যে একটি আবেগের শক্ত বাধন আলগা হয়ে গেছে। বেড়ে গেছে মনের দূরত্বও।
বাংলাদেশের মনুষের গড় আয়ু বাড়ছে। একজন বয়স্ক মানুষ জীবন চলার পথের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে জীবনের এপার ওপার সব কিছুই দেখতে পান। পিছনে ফেলে আসা দিনগুলোর আনন্দ, বেদনা ব্যর্থতা সফলতার স্মৃতি যেমন তাকে একরকম মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে, তেমনি বেদনায় ভারাক্রান্ত করে। আনন্দের স্মৃতির চেয়ে ব্যর্থতার দায় যেন তাকে বেশি বিষন্ন করে তোলে। কারণ তার সন্মুখে যেন আর আগামী নেই। এই দীর্ঘ বার্ধক্যে প্রবীণেরা আবার যেন শৈশবে ফিরে যান। শিশুর মতোই অসহায়, অভিমানী, সংবেদনশীল হয়ে পড়েন; সন্তানকে অবলম্বন করে বাঁচতে চান। প্রবীণ বা বয়স্ক এই মানুষটি জানেন কোন কিছু ভাংগা বা গড়ার সাধ্য তার নেই। তার যা আছে তা হলো তার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা এবং করুণ অনুভূতি।
পরিবারের বয়স্ক মানুষকে মান্য করা, তাকে একটুখানি গুরুত্ব দেয়া, তার অসুবিধার জায়গাগুলোতে তাকে সাহায্য করা, তাকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখা এতো ছিল এক সময় আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের গৌরবোজ্জল ইতিহাস। এমনও মূল্যবোধ এক সময় সমাজে ছিল যে, একজন বয়স্ক মানুষ ঘরে থাকলে মনে করা হতো পরিবারটি একটি বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়ার নিচে রয়েছে। কিন্তু এই আধুনিকায়নের যুগে, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির অনুপ্রবেশে স্বাধীনতার নামে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয় পরিবারের মানুষগুলো। পরিবারের বয়স্ক মানুষটিকে অমান্য করে, তার ভালবাসার বাইরে গিয়ে আমরা যে স্বাধীনতার কথা বলি তা হচ্ছে সন্তানকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়া। মা বাবার ভালবাসা ও পরিবারিক বন্ধন ব্যতিত একটি সন্তান সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। যে জীবন পেয়ে মানুষ ধন্য, যে জীবন পেয়ে মানুষ এ সুন্দর পৃথিবীর অফুরন্ত সৌন্দর্য দুচোখ ভরে দেখার সুযোগ পায়, সেই জীবনের জন্য সন্তান মা বাবার কাছে ঋণী। মা বাবা শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, ধনী বা গরীব, বিবেচক বা অবিবেচক যাই হউক না কেন, তাদের ভালবাসার দানকে অস্বীকার করার সাধ্য কোন সন্তানের নেই। তাই প্রবীণ বয়সে মা বাবা যেন কান কারণে দু:খ বা কষ্ট না পান সে দিকে সন্তানের খেয়াল রাখতে হবে।
বিশ্বায়ন ও আধুনিকায়নের প্রভাবে পাশ্চাত্যের মতো আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে একক পরিবার বা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। এই অণু পরিবারগুলোর সন্তানেরা যখন দেখছেন মা বাবা, দাদা দাদি বা নানা নানির দেখাশোনা করছেন না তখন তাদের অবচেতন মনে দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা গেঁথে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে তারা এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছেন। মা বাবা নিজেরা তাদের মা বাবার প্রতি যতœশীল হয়ে উদাহরণ স্থাপন করলে পরবর্তী প্রজন্ম এ থেকে শিখবে। এর পাশাপাশি সন্তানদের ভেতর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের বীজ বুনে দেয়াটাও জরুরি। মা বাবার সাথে সহজ, সুন্দও, মধুর , ন¤্র ব্যবহার করা উচিত। যা দেখে তাদের সন্তানেরাও সেটা শিখতে পারে। বিজ্ঞান ক্রমশ: বাড়িয়ে দিচ্ছে বেগ, আর কেড়ে নিচ্ছে আবেগ। এ আবেগ যখন একবারে নি:শেষ হবে সেদিন মানুষ আর মানুষ থাকবেনা। তাই মনে রাখতে হবে বেগের চাইতে আবেগের মূল্য অনেক বেশি।

দায়িত্বে সবার অংশগ্রহণ:
একজন সন্তানের একার পক্ষে বয়স্ক মা বাবার পুরো দায়িত্ব নেওয়াটা বাস্তবে কঠিন। তাদের যতœ- আত্তি, চিকিৎসা ভরনপোষণের ভার সব ভাইবোন মিলে ভাগাভাগি করে নিতে চাইলেও অনেক সময় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে। তাই মা বাবার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে ভাইবোনেরা একসঙ্গে বসতে পারেন। কেউ অতীতে মা বাবার প্রতি দায়িত্বে গাফিলতি দেখিয়ে তাকলে তাকে সেটা মনে করিয়ে দোষারোপ না করাই ভালো। তাতে পরিবেশ কলুষিত হতে পারে। শান্তভাবে পুরো বিষয়টা পরিচালনা করা উচিত। মা বাবার শারীরিক অবস্থা মানসিক চাহিদা ইত্যাদি নিয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে করণীয় বিষয়গুলো ঠিক করে ফেলা যায়। মা বাবা কি চান, কোথায় থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তা-ও মাথায় রাখতে হবে। দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়টি সুনির্দিষ্ট ও সুষ্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত হওয়া চাই, যাতে করে ভূল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকে।
আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মা বাবা ছেলের কাছে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অনেক সময় পূত্রবধুরা বাঁধা হয়ে দাড়ান। আবার মেয়ে যদি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হন, তাহলে মা বাবাকে নিজের সংসারে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়ে। বৃদ্ধ বয়সে মা বাবারা শারীরিক ভাবেতো বটেই, মানসিক ভাবেও দুর্বল হয়ে পড়েন। এ সময় তাদের সেবায় সন্তানকে খুবই যতœবান থাকা উচিত। মেয়েরা এ ক্ষেত্রে যতটা ইমোশনাল সাপোর্ট দিতে পারেন ছেলেনা ততটা পারেন না। এখনকার ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজে ছেলেমেয়েরা যার যার জীবন নিয়ে এতটা মগ্ন থাকেন যে, মা বাবার জন্য সময় বের করাটা তাদের কাছে অসম্ভব মনে হয়। একাধিক ভাইবোন থাকলে দায়িত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলি লাগে। ভাইবোনদের মধ্যে আন্তরিকতা, বোঝাপড়া থাকলে বৃদ্ধ মা বাবার দায়িত্ব নিয়ে রেষারেষি হবে না।
অনেকে পেশাগত ব্যস্ততার কারণে, অনেকে আবার জীবনসঙ্গীর বাঁধায় এ দায়িত্ব এড়াতে চান। অনেকে পিছপা হয় অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতায়, কেউ কেউ স্রেফ আত্মকেন্দ্রিকতায় কিংবা স্বার্থপরতায়। ভাইবোনদের কেউ হয়ত ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ব নিতে অভ্যাস্ত। বাকি ভাইবোনেরা তার ঘাড়েই মা বাবাকে ফেলতে চান। কেউ আবার ছেলেবেলার আদুরে কিংবা আনাড়ি ভাবমূর্তি বজায় রেখে দায়িত্বের মতো গুরুভার নিতে নারাজ। কিন্তু মনে রাখতে হবে প্রবীন বয়সে মা বাবার দায়ত্বিকে সর্বোচ্চ আসনে স্থান দিতে হবে সন্তানকে।
ভাইবোনদের মধ্যে পুরানো কোন দ্বন্দ্ব থাকলে নিরপেক্ষ স্বভাবের কাউকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাখা যেতে পারে। প্রত্যেকের সুবিধা অসুবিধা বিবেচনায় এনে ঐক্যমত্যে পৌছানো উচিত। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যার উপর মা বাবার দৈনন্দিন দায়িত্ব বর্তাবে, তার পাশাপাশি আমাদেরও ঠিক করে নেয়া উচিত যে সেই সময়টায় তাদের ভূমিকা কি হবে। মা বাবার অসুস্থতায় কার কাছে কি ধরনের সহযোগিতা কাম্য তা-ও খোলাখুলি আলোচনা করে নেওয়া ভালো। যিনি অর্থনৈতিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল, তিনি মা বাবার আর্থিক প্রয়োজনীয়তার দিকটায় বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। যিনি পেশাগত জীবনে অপেক্ষাকৃত কম ব্যস্ত, তিনি মা বাবাকে বেশি সঙ্গ দিতে পারেন।

শুধু দায়িত্ববোধ নয়, দিতে হবে ভালোবাসা:
আমাদের এই উঠতি নব্য সমাজে এমন এমন পরিবার আছে যারা নিজেদের বন্ধুবান্ধব অতিথি অভ্যাগতদের সঙ্গে বৃদ্ধ মা বাবাকে পরিচয় করিয়ে দিতে চান না। অনেক সময় বলেন তুমি ভিতরে যাও, আমাদের মাঝে এসো না। এতে বয়স্কদের মনে কষ্ট হয়। তিনি তো পরিবারের কাছে কিছুই চান না। চান শুধু সম্মান, ভালবাসা আর পাশে থাকার একটু সময়। এটুকু কি আমরা আমাদের মা বাবাকে দিতে পারিনা। যাদের জন্য পৃথিবীর আলো দেখা, যার হাত ধরে হাটতে শেখা, যার দেখানো পথে পথ চলা, তার জন্য কি আমরা কিছুটা সময়, কিছুটা মনোযোগ দিতে পারিনা? বয়স্ক মানুষটি থাকবেন সব কিছুতে সবার সঙ্গে এমন অনুভূতি, এমন ভরসা যদি তাকে দেয়া যায় তবে যতটা দিন তিনি বেঁচে থাকবেন অন্তত নিজেকে মূল্যহীন ভাববেন না।
এই আধুনিকায়নের যুগে একজন মানুষের অবসর জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম হচ্ছে তার একাকিত্ব। এই একাকিত্ব যতোটা না তার বাইরের তার চেয়ে বেশি তার ভিতরের জগতের। পরিবারের সকলের অমনোযোগীতার আড়ালে আস্তে আস্তে বয়স্ক মনুষটির জীবন যে ফুরিয়ে আসে, পরিবারের অনেকেই তা বুঝতে পারে না। আর এই বয়সে মা বাবার প্রয়োজন ফুরিয়েছে বলে তাদের জীবন থেকে বাতিল করে দেয় অনেকেই। অজুহাতে বিশাল তালিকা বানিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। অথচ এ দায়দায়িত্ব সব ভাইবোন মিলে পালাক্রমে পালন করলে কারও একার উপর বিরাট চাপ পড়ে না। আবার মা বাবা অনেক সময়ই সন্তানের প্রতি আকাশচুম্বী অবাস্তব প্রত্যাশা করে কষ্ট পান। এসব ক্ষেত্রে তাদের পরিস্থিতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে বুঝিয়ে বললে ভূল বেঝাবুঝি কমে যায়। তাই পুরো ব্যাপারটিকে শুধু দায়িত্ববোধের দিক থেকে দেখাটা হয়তো ঠিক হবে না। মা বাবার অপরিসীম ভালবাসার ন্যূনতম প্রতিদানও যদি কেউ দিতে চান , তাকে ভালোবাসাই দিতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *