প্রবীণদের প্রতি নজর দিন

প্রফেসর মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান:
ওল্ড ইজ গোল্ড কথাটি শৈশবেই শুনেছিলাম তবে তখন বুঝতে পারিনি এর গুরুত্ব। ক্রমেই উপলব্ধি করলাম এ কথার বাস্তবতা। মানুষ জীবনের পথপরিক্রমায় অনেক কিছুর বিনিময়ে সবচেয়ে মূল্যবান যা অর্জন করে তা হলো অভিজ্ঞতা। তাই তো প্রবীণ মানেই অভিজ্ঞতা যা নবীনদের চলার পথে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

অভিজ্ঞতার আলো দিয়েই নবীনরা গড়বে দেশ, জাতিকে নেবে সামনের দিকে এগিয়ে, আর রচনা করবে কল্যাণকর সুন্দর জীবনের পথ। বাংলাদেশের সনাতনী শিক্ষায় প্রবীণদের অর্থাৎ পিতা-মাতা ও গুরুজনদের ভক্তি, শ্রদ্ধা, সেবা-শুশ্রূষা করার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হতো। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসনে প্রবীণদের সেবা, যত্ন করার অনুপ্রেরণা ছিল যা আজ তথাকথিত আধুনিকতার আঘাতে বিলুপ্ত হতে চলেছে। আবার বাংলাদেশের প্রবীণদের অবস্থা পারিবারিক পর্যায়ে ঐতিহ্যগতভাবে ভালো থাকলেও ক্রমান্বয়ে একান্নভুক্ত পরিবার প্রথা বিলুপ্তি ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে পরিবারে প্রবীণ ব্যক্তির জীবনের নিরাপত্তা আজ কঠিন অবস্থার মুখোমুখি।

আধুনিকতার প্রভাবে বিবাহের পর নিজ সন্তানেরা দ্রুত ভিন্ন পরিবার গঠন করে, ফলে আমাদের দেশের যৌথ পরিবার ভিত্তি ভেঙে পড়েছে। যার ফলশ্রুতিতে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রবীণরা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অসহায়বোধ করে। পুত্র ও পুত্রবধূর সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রবীণদের বার্ধক্যে নিজের জীবনধারণের জন্য অন্যের সাহায্য প্রার্থনা করতে হয়। আবার ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েরা পিতা-মাতাকে ফেলে বিদেশে পাড়ি জমানোর কারণে আর্থিক সচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও প্রবীণদের একাকিত্ব নিয়ে নিঃসঙ্গভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয় যা খুবই বেদনাদায়ক। আর রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের প্রবীণদের অবস্থার চিত্র আরও করুণ। কেননা রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের প্রবীণদের কল্যাণের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত।

আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আমাদের প্রবীণদের ন্যূনতম মর্যাদা প্রদান বা তার কর্মময় জীবনের স্বীকৃতির কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের দেশের প্রবীণদের কল্যাণের কার্যক্রমের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে যে কতিপয় মহত্প্রাণ মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসেন প্রবীণদের হিতৈষী রূপে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জাকির হোসেনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ওয়াহেদ প্রবীণদের কল্যাণার্থে ১৯৬০ সালের ১০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠা করেন Association for the Aged. এ সংস্থার প্রথম প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন গভর্নর জাকির হোসেন এবং সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন ডা. ওয়াহেদ। পরবর্তীতে প্রবীণদের কল্যাণে সংগঠিত হয়ে যারা মূল্যবান অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহীম, আলমগীর এম এ কবীর, আজিজুল হক, বিচারপতি আবদুল ওয়াদুদ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা প্রবীণ হিতৈষী সংঘ প্রবীণদের কল্যাণে কাজ করে চলেছে। যদিও বাংলাদেশে দুর্দশায় আচ্ছন্ন বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষের জন্য কাজ করার এ উদ্যোগ খুবই সামান্য। তাই তো প্রয়োজন আরও অনেক প্রকল্পের ও অনেক কার্যক্রমের। তা সেটা সরকারি আর বেসরকারি পর্যায়ের হোক। ব্রিটিশ আমল থেকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন প্রথা রয়েছে। কিন্তু তা তো কেবল মুষ্টিমেয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। দেশের বিপুলসংখ্যক প্রবীণ নাগরিক এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

তবে আশার কথা বিশ্বের উন্নত সব দেশের সব প্রবীণ মানুষের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য পেনশন ব্যবহার অনুসরণে আমাদের তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৯৭-২০০২) প্রবীণদের জন্য চার কোটি টাকা বরাদ্দ করে। তা থেকে ১৯৯৮ সালের ৩১ মে থেকে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে বসবাসরত দুস্থ প্রবীণকে মাসিক ১০০ টাকা হারে বয়স্কভাতা প্রদান শুরু করা হয়। পরবর্তীতে এ বয়স্কভাতা কিছুটা বৃদ্ধি করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এ কল্যাণকর ব্যবস্থার জন্য সরকার নন্দিত হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনা এর সংখ্যা ও পরিমাণগত অবস্থা খুবই অপ্রতুল।

বিগত সরকারের আমলে ২০০২ সাল থেকে অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য অবসর সুবিধা ভাতা প্রদানের সূচনা করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

এক তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ শতাংশ প্রবীণ মানুষ। প্রকৃতপক্ষে এ প্রবীণ মানুষেরাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অভিভাবক। প্রবীণরা তাদের সারা জীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও বিচক্ষণতা দিয়েই সঠিক পথনির্দেশ করতে পারেন। প্রবীণদের বলা হয় জীবন্ত ইতিহাস যা অতীত ও বর্তমানের মাঝে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। তাই এসব জ্ঞানের ভাণ্ডারকে অবহেলা না করে বরং তাদের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে আমাদের দেশে ও জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির কাজে প্রয়োগ করতে হবে। প্রবীণদের কল্যাণে আমাদের অতীতের গৌরবময় মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে।

আমাদের শিক্ষার প্রতিটি স্তরের পাঠ্যসূচিতে প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য ও দায়বদ্ধতার কথা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে নতুন প্রজন্ম পিতা-মাতা ও গুরুজনদের বার্ধক্যে সম্মান প্রদর্শন, সেবাদান, ভরণপোষণ ও পরিচর্যায় ব্রতী হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবীণদের মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য পরিচিতি পত্র প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি দফতরে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পৃথক কাউন্টারের ব্যবস্থা করতে হবে। রেলওয়েসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি যানবাহনে প্রবীণদের জন্য অন্ততপক্ষে ৩০% ভাড়া কম গ্রহণ করতে হবে এবং যানবাহনগুলোতে প্রবীণদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্বল্প ব্যয়ে প্রয়োজনে বিনা ব্যয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। সব দুস্থ ও উপযুক্ত বয়স্কদের বয়স্কভাতা দিতে হবে। বয়স্কভাতার অর্থের পরিমাণ সম্ভবমতো বাড়াতে হবে। এ কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে আজকের সব নবীনকে একদিন বার্ধক্যের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। প্রবীণ কৃতী নাগরিকদের কোনো অবস্থাতেই বোঝা মনে না করে বরং তাদের কল্যাণে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র যথার্থ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে ঋণ পরিশোধ করবে আজকের দিনে এ প্রত্যাশাই করি।

লেখক : প্রাক্তন ট্রেজারার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *