বয়স্কদের যত্ন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব

আমাদের সামাজিক জীবন অনেকাংশে এখন পুঁজিবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসনের শিকার। যান্ত্রিক ও ভোগবাদী মানসিকতার কারণে সামাজিক, পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত সর্ম্পকগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বৃদ্ধ পিতা-মাতা ও পরিবারের প্রবীণদের প্রতি সম্মান, কর্তব্যবোধ ও ভালোবাসা কমে যাচ্ছে। ফলে পরিবারের বয়োবৃদ্ধরা এখন সন্তান বা নির্ভরশীলদের কাছে বোঝাস্বরূপ।

মানুষের জীবনের বড় অভিশাপ দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটানো যে কত কষ্টের, কত বেদনার, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। আর সেই দারিদ্র্য যদি হয় বৃদ্ধ বয়সে, তাহলে তো বেঁচে থাকাটাই দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। দেশে সমস্যার অন্ত নেই। পরিপূর্ণ আহার, প্রয়োজনীয় বাসস্থান ও ন্যূনতম চিকিৎসা পাওয়া থেকে এখনও বঞ্চিত কোটি কোটি মানুষ। এর মধ্যে একটি বড় অংশ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও প্রবীণ। দেশে বয়স্ক বা প্রবীণের সংখ্যা কত এবং এদের মধ্যে অসহায় কত ভাগ, তার সঠিক পরিসংখ্যানও নেই। প্রবীণ হিতৈষী সংঘের জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রবীণের সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ এবং ২০২৫ সালে তা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় পৌনে দুই কোটিতে। উদ্বেগের বিষয়, পৃথিবীর অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের দেশে প্রবীণের সংখ্যা বেশি, এমনকি অসহায় প্রবীণের সংখ্যাও বেশি। উন্নত দেশে যে পরিমাণ মানুষ বাস করে, তার চেয়ে বেশি মানুষ প্রবীণ অবস্থায় অসহায় ও আশ্রয়হীন জীবন-যাপন করে আমাদের দেশে।

দারিদ্র্যের মাঝে বসবাস করা যে কোন বয়সের মানুষের জন্যই কষ্টকর। আর বৃদ্ধ বা প্রবীণ বয়সে দারিদ্র্যের সঙ্গে জীবন-যাপনের দুর্যোগ অবর্ণনীয়। বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক শেক্সপীয়র বার্ধক্যকে আখ্যায়িত করেছেন দ্বিতীয় শৈশবকাল। তবে এই দুই শিশুকালের পরিবেশ ও অবস্থা হয় ভিন্ন রকমের। প্রথম শিশুকাল ভরা থাকে সবার আদর-স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসায়। এ শিশুকালে দেখাশোনা ও লালন-পালনের জন্য মা-বাবা ছাড়াও থাকে ভাই-বোন, দাদা-দাদীসহ আত্মীয় স্বজন। কিন্তু দ্বিতীয় শিশুকাল অর্থাৎ প্রবীণ বয়সে ভালোবাসার আধার ও প্রধান অবলম্বন মা-বাবাই জীবিত থাকেন না, যারা তখনও বেঁচে থাকেন তারা তো প্রবীণেরও প্রবীণ। এই বার্ধক্য জীবনে এসে সন্তান-সন্ততির কাছ থেকে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ও আদর পায় কজন? অধিকাংশ বৃদ্ধ মাতা-পিতার জীবন কাটে অনাদর আর অবহেলায়। অনেক সন্তানই তাদের বোঝা মনে করে বের করে দেয় বাড়ী থেকে। দয়াপরবশ (!) হয়ে কেউ কেউ পাঠায় বৃদ্ধাশ্রমে। বের করে দেয়া এসব প্রবীণের ঠিকানা হয় রাস্তা, ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ইত্যাদি জায়গায়। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, যে সন্তানকে মানুষ করার জন্য বাবা-মা সারা জীবন কষ্ট করে গেছেন, সন্তানের সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন, সেই নরাধম সন্তানের দ্বারা নিগৃহীত হয়ে বৃদ্ধ মা-বাবার শেষ জীবন অতিবাহিত হয় অতিকষ্টে।

বিভিন্ন দেশে প্রবীণদের খাওয়া-পরা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে রাষ্ট্র। বাংলাদেশে ব্যবস্থা কল্পনাও করা যায় না। এ কারণেই রাস্তায় বয়োবৃদ্ধ ভিক্ষুক, ছিন্নমূল ও ভবঘুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে উদ্বেগজনক হারে। ১ কোটির কাছাকাছি প্রবীণের জন্য সরকারী পর্যায়ে প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান নামে দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় ঐ প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রম যৎসামান্য বললেও বেশি বলা হয় না। তাহলে কি দেশের অসহায় প্রবীণদের শেষ জীবন অর্ধাহারে-অনাহারে বা বিনা চিকিৎসায় কাটবে? আমাদের অর্থাৎ সামর্থ্যবানদের কি কিছুই করার নেই? আছে। আশার কথা ব্যক্তি পর্যায়ে কেউ কেউ অসহায় প্রবীণদের প্রতি ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বস্তুত, আমাদের সবারই উচিত স্ব-স্ব অবস্থান থেকে অসহায় বয়স্কদের প্রতি দায়িত্ব পালন করা। আর্থিকভাবে না পারলেও অন্তত মানসিকভাবে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। একটু ভালোবাসা, একটু সহানুভূতি দেখানো মোটেও কঠিন কিছু নয়।

পৃথিবীতে পিতা-মাতা সবার ঊর্ধ্বে। সন্তানের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার, যথাযথ মর্যাদা এবং সেবা-পরিচর্যা পাওয়া অনুকম্পা নয়, এটা তাদের অধিকার। তাদের এ অধিকার থেকে বঞ্চিতকারীরা ঘৃণ্য ও পাপী ব্যক্তি হিসেবেই পরিগণিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *