ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন

মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে পৃথিবীতে যে সকল আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, তার মধ্যে বাঙালীর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শ্রেষ্ঠতম। যে কারণে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। ‘আব্দুল মতিন’ এমন একটি নাম যে নামটি বহন করে চলেছে এক প্রাচুর্যময় ইতিহাস। ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই দাবিতে সেই আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাই তিনি ‌’ভাষা মতিন’ হিসেবে খ্যাত। তিনি ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। জীবনবাজি রেখে ভাষা সংগ্রাম করা এই মহানমানব মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদান করেন।

ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন। ছবিসূত্রঃ দৈনিক সমকাল

জন্ম ও বংশ পরিচয়
সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার একটি ছোট্ট সবুজ গ্রাম ধুবালীয়া। নীল আকাশ আর সবুজ জমিন যেখানে একাকার হয়ে আছে সেখানেই ধুবালীয়া গ্রাম। ১৯২৬ সালের ৩রা ডিসেম্বর এক কনকনে শীতের রাতে বাবা আব্দুল জলিল ও মা আমেনা খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম হল আব্দুল মতিনের। দুধসাদা গায়ের রং, ফুটফুটে সুন্দর চেহারা। দেবদূতের মত মুখখানি দেখলে যেন মনটা জুড়িয়ে যায়। হয়তবা আমেনা খাতুনের ভালবাসা আর ভালবাসা মাখানো একফোটা চোখের পানি নজর টিপ হয়ে সারাটা জীবন আব্দুল মতিনকে রক্ষা করেছে। মায়া জড়ানো হাসি, গালে গোলাপি আভা, সারা গায়ে আদর মাখা এই শিশুটিকে তাই আদর করে সবাই ডাকত ‘গেদু’ বলে। আব্দুল জলিল ও আমেনা খাতুনের প্রথম ছেলে গেদু। তাঁরা তাঁদের আদরের ছেলেকে নিয়ে বেশিদিন সুখে সংসার করতে পারেনি। কারণ কিছু দিন পর সর্বনাশা যমুনা নদী তাঁদের সর্বস্ব গ্রাস করে নিলো।
মধ্যবিত্ত কৃষক আব্দুল জলিল যখন অনেক ঘাম ঝরিয়ে নতুন বাসস্থান গড়ে তুললেন তখন আবার তাঁদের সংসারে খুশির ছোঁয়া লাগে। কিন্তু চির বহমান সেই শান্ত যমুনা আবার ক্ষেপে ওঠে। গ্রাস করার নেশায়, উম্মাদ, মাতাল যমুনা ফুঁসে ওঠে। সর্বগ্রাসী যমুনা তলিয়ে নেয়, ভাসিয়ে নিয়ে যায় মধ্যবিত্ত জলিলের ঘরের সর্বস্ব। এই অসহায় অবস্থার মধ্যেই ম্যাট্রিকুলেট আব্দুল জলিল একটি চাকুরী খুঁজতে থাকেন। ১৯৩০ সালের কথা। সুপারভাইস স্টাফ হিসাবে মাত্র ৫০ টাকার বেতনে আব্দুল জলিলের চাকুরী হয় জালাপাহারের ক্যান্টনমেন্টে। আব্দুল জলিল তাঁর সব কিছু চুকিয়ে দিয়ে হিমালয়ের দাজিলিং এ গিয়ে উপস্থিত হন এক নতুন স্বপ্নের আশায়।

এরপর ১৯৩২ সালে পরিবারসহ থাকার জন্য তিনি স্টাফ কোয়ার্টার পেলেন। তিন ছেলে আর এক মেয়ে সহ মোট ছয় জনের পরিবার নিয়ে নতুন জীবন শুরু হল দার্জিলিং এর জালাপাহারে। অনেক সুখের আর আনন্দের ছিল সেই সময়টা। ধুবালিয়া গ্রামের সেই ভাঙা গড়ার খেলা নেই, নেই অস্বচ্ছলতা। অন্তত জীবনের নিশ্চয়তা খুঁজে পাওয়া গেল। জীবন যেন ছন্দ খুজে পেল। সময়গুলো যেন বাতাসে ভর করে উড়ে বেড়াতে লাগল। কিন্তু ১৯৩৩ সালে গেদুর (আব্দুল মতিনের) যখন ৮ বছর তখনই আবার ছঁন্দ পতন ঘটল জীবনের। চিকিত্‍সার অভাবে অ্যাকলেমশিয়া রোগে মারা গেলেন তাঁর মা। শৈশবে মাতৃহারা মতিনের মধ্যে তাই সব সময় মায়ের জন্য একটা মমতা কাজ করতো। এই মমত্ববোধই তাঁকে ভাষার জন্য লড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।

শৈশবের দার্জিলিং
আকাশের বিশালতা আর পাহাড়ের চূড়া ছূঁয়ে যায় পেজা পেজা মেঘ। দুরন্তপনায় ছুটে বেড়ানো এই মেঘগুলো থমকে দাঁড়ায় এক জানালায় এসে। অবাক বিস্ময়ে দেখে মা হারা এক ছেলে ওদের যেন বুঝতে চায়, জানতে চায়। কিছু স্বপ্ন আর মায়া জড়ানো ঐ কচি মুখখানি, সজিব চোখ দু’টো কি যেন খুঁজে বেড়ায়। আর মেঘগুলো তাই আরো কাছে আসে। এরপর জানালার কাছে বিন্দু বিন্দু পানি হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। মায়ের ভালবাসা, স্নেহ, আদর প্রত্যাশী এক সম্ভাবনাময় ছেলেকে ওদের ভালবাসতে ইচ্ছে করে। আর মেঘেরা ছেলেটাকে আকাশ ছোঁয়া বিশালতা আর পাহাড়ময় স্বপ্ন এঁকে দিয়ে যায়। এই বিশালতা আর স্বপ্নকে ধারণ করে চিন্তার ক্ষেত্রটাকে বিস্তৃত করে চলে সেই ক্ষুদে আব্দুল মতিন।
দার্জিলিং-এর বাংলা মিডিয়াম স্কুল মহারানী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৩২ সালে আব্দুল মতিন শিশু শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন এবং তখন থেকেই শুরু হল তাঁর শিক্ষা জীবন। খুব স্বল্প রোজগার হলেও আব্দুল মতিনের বাবা ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলেন। আব্দুল মতিনও অনেক আগ্রহ আর উত্‍সাহ নিয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরম আশ্রয় আর ভালবাসার জায়গাটুকু অর্থাত্‍ মাকে হারিয়ে আব্দুল মতিন হয়ে পড়েন অসহায়। উচ্ছল, উজ্জ্বল, আনন্দে ভরপুর পৃথিবীটা যেন হঠাত্‍ মৃতময়, অনুজ্জ্বল আর অষ্পষ্ট হয়ে গেল। মাকে ছাড়া, মায়ের ভালবাসা ছাড়া পৃথিবীটা তার কাছে অর্থহীন হয়ে গেল। এই দুনিয়াটাকে তার আর আপন মনে হত না। মায়ের ভালবাসা পাওয়ার জন্য বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করত । হাহাকার করত শূণ্য হৃদয়। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়টা একটুখানি আশ্রয় আর ভালবাসা খুঁজে ফিরত। কিন্তু কোথায় সেই আদর, সেই মায়ের কোলের নিশ্চয়তা। কোথায় গেলে একটুখানি শান্তি পাওয়া যাবে। তার এই কষ্ট, মা হারানোর জ্বালা আরও দ্বিগুন হয়ে গেল যখন তার বাবা আবার বিয়ে করে তাদের জন্য নতুন মা নিয়ে আসলেন। এক ছোট্ট মাতৃহারা অসহায় শিশুর ক্ষত-বিক্ষত অন্তরের দগদগে ঘায়ে যে কতখানি ব্যথা হল সে খবর কেউ নিল না। আর এভাবেই এই শিশুটার জীবন হয়ে পড়ল ছন্নছাড়া।

শিক্ষা জীবন
আব্দুল মতিনের পড়াশুনা শুরু হয় মহারানী গার্লস স্কুলে। ৪র্থ শ্রেণী পাশ করলে প্রাইমারী স্তরের যবনিকা ঘটে। এরপর ১৯৩৬ সালে দার্জিলিং গভর্মেন্ট হাই স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। কিন্তু স্কুল, পড়ালেখা, পরিবার কোন কিছুই আর তাঁর মনোযোগ ধরে রাখতে পারেনি। পাথর চাপা দিয়ে রাখা কষ্টগুলো বার বার তাঁকে উতলা করেছে। মনটা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। স্কুল, পরিবার, মা হারানোর জ্বালা সবকিছুকে মেলাতে গিয়ে আব্দুল মতিন, মায়ের অনেক আদরের গেদু আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন। বড় বেশি অভাগা মনে হত নিজেকে। জমিয়ে রাখা কষ্টগুলো, দুঃখগুলো, ব্যথাগুলো দেখানোর মত কেউ ছিল না। বড় অভিমানী এই ছেলের অভিমানকে প্রশ্রয় দেয়ার মত কেউ ছিল না। বাবা মাথায় হাত রেখে বলত না- কষ্টগুলো আমাকে দাও। মায়ের মত বুকে জড়িয়ে সব ব্যথা মুছেও দিত না। ভালবাসা দিয়ে সকল অশান্তি নিঃশেষ করে আত্মাকে জুড়িয়ে দিত না। আর তাই মায়ের ভালবাসার কাঙাল, অতৃপ্ত হৃদয়ের এক নাবালক ছেলে, নিজেকে গুটিয়ে নিল সমস্ত কিছু থেকে।
ভীষণ অনীহা নিয়েও একাডেমিক জীবনটাকে ধরে রেখেছিলেন তিনি। এই অবস্থার মধ্যেই তিনি ১৯৪৩ সালে এনট্রান্স পরীক্ষা দিলেন (Secondary Certificate Examination)। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন ৩য় বিভাগ নিয়ে। একাডেমিক শিক্ষার প্রতি অনেক অবহেলা থাকলেও, চিন্তার জায়গাটাকে সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধ রাখেননি কখনো। তাঁর চিন্তার বাহু, শাখা-প্রশাখা সুনির্দিষ্ট জায়গায় থেমে থাকেনি তা বিস্তৃতি লাভ করেছে বহু দূর পর্যন্ত। তিনি মনীষিদের জীবনী পড়া শুরু করলেন। হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর জীবনী পড়তে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। একজন মানুষ কিভাবে এত শক্তি অর্জন করতে পারে! তিনি অভিভূত হয়ে লক্ষ্য করলেন, মিথ্যা মানুষকে মনকে দূর্বল করে দেয়। আমাদের বিশ্ব নবী সত্যবাদী ছিলেন আর সততা ও সত্যবাদিতা তাকে নব নব শক্তি যুগিয়েছে প্রতিটি মূহুর্তে। শত আঘাতও তাকে ভাঙতে পারেনি। স্বশিক্ষিত হতে, নিজেকে পরিপূর্ণ মানুষ করে গড়ে তুলতে মহানবী (সঃ) এর কোন অক্ষর জ্ঞান এমন কি কোন একাডেমিক শিক্ষার প্রয়োজন হয়নি। আব্দুল মতিনও এই আদর্শ ধারণ করেন। মিথ্যাকে পরিহার করার চেষ্টা করতে থাকেন এবং মনকে নতুন করে রূপ দেবার এক অদম্য ইচ্ছা জেগে ওঠে তাঁর মধ্যে।

ইতোমধ্যে ২য় বিশ্বযুদ্ধ বিরাট আকার ধারণ করেছে। এই সময়ে তাঁর বাবার ২টি স্টেশনারী দোকানের বেশ উন্নতি হয়। যেখান থেকে অতিরিক্ত আয়ের মাধ্যমে তাঁদের পরিবারে স্বচ্ছলতা এসে ধরা দেয়। আব্দুল মতিন আর তাঁর ছোট ভাই আব্দুল জব্বার তাঁর বাবাকে এই কাজে সহযোগিতা করতেন। আব্দুল মতিনের বাবা চাইলেন ছেলে দার্জিলিং এ ভাল কোন কলেজে ভর্তি হোক। কিন্তু একরোখা আব্দুল মতিন পরিবারের বাঁধন ছিন্ন করে নিজেকে আলাদা করতে চাইলেন। নরম-কমল, সেই ছোট্ট হৃদয়টা যখন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, তখন সেই দুমরে মুচরে যাওয়া হৃদয়টার যত্ম কেউ নেয়নি। আর তাই সেই ভঙ্গুর হৃদয় নিয়ে আব্দুল মতিন পরিবারে মন বসাতে পারলেন না। পলাতক মনটা তাই পরিবার থেকে পালাতে চাইলো। যে পরিবারে তাঁর কষ্টগুলো, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, কান্না-হাসিকে প্রশয় দেবার মত কেউ নেই, সে পরিবার কিভাবে তাঁকে ধরে রাখবে? অনেক হাসি, অনেক আনন্দ নিয়ে, কখনো বা অনেক বেদনা, অনেক হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের কোলে মুখ গুজে নিজেকে কখনো বিলীন করে দিতে পারেননি। এই কষ্টগুলো তাঁর সারা জীবনের। নিজের অনুভূতিগুলো পরিবারের সাথে বিনিময় করতে না পেরে তাঁর মনে অনেক ক্ষোভ তৈরি হয়েছিলো। সেজন্যই তিনি সব সময় পরিবার ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে চেয়েছেন। আব্দুল মতিনের বাবা কিছুতেই তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে তাঁকে টলাতে পারেননি। তিনি আবার মাতৃভূমি পাবনায় ফিরে আসেন। আব্দুল মতিনের মামা তাঁকে পাবনা এ্যাডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও আব্দুল মতিনের দ্বিমত ছিল। তিনি পরিবারের কারো সঙ্গেই নিজেকে জড়িয়ে রাখতে চাননি। সবার প্রতি তাঁর এক ধরণের চাপা অসন্তোষ ছিল।

অবশেষে ১৯৪৩ সালে রাজশাহী গভর্মেন্ট কলেজে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে ভর্তি হলেন। কলেজ ক্যাম্পাসের নতুন হোস্টেলের একটি রুমে থেকে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে লাগলেন। যদিও লেখাপড়ার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনীহা। পাঠ্যবই মুখস্ত করার মত মানসিকতা তাঁর কখোনোই ছিল না। প্রতিদিন ক্লাস করতেন এবং ক্লাস নোট পড়ে পরীক্ষা দিতেন। ২ বছর পর ১৯৪৫ সালে তিনি এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং তৃতীয় বিভাগ নিয়ে উত্তীর্ণ হন।

এই সময় তাঁর মন আবার নতুনত্বের নেশায় উন্মুখ হয়ে উঠে। থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে/ দেখব এবার জগত্‍টাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ/ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে। যদিও তিনি বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ ছিলেন না, তবুও দুনিয়াটাকে আরও কাছে থেকে জানতে, চিনতে তাঁর মনের ভেতর আকুপাকু করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরম আকার যদিও কিছুটা স্তিমিত হয়ে গেছে তবুও যুদ্ধকে কাছে থেকে দেখার জন্য, মানুষের কষ্টকে ভালভাবে উপলব্ধি করার জন্য আব্দুল মতিন বৃটিশ আর্মির কমিশন র‌্যাঙ্কে ভর্তি পরীক্ষা দেন। দৈহিক আকৃতি, উচ্চতা আত্মবিশ্বাস আর সাহসিকতার বলে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম থেকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কমিশন পান। এরপর কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর গিয়ে পৌছান। কিন্তু ততদিনে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। ফলে তিনি একটি সার্টিফিকেট নিয়ে আবার দেশে ফিরে এলেন। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর অব আর্টস (পাশ কোর্স)-এ ভর্তি হলেন। ফজলুল হক হলে তাঁর সিট হয়। ১৯৪৭ সালে গ্র্যাজুয়েশন কোর্স শেষ করেন এবং পরে মাস্টার্স করেন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন বিভাগ থেকে। অনার্স কোর্স থেকে পাশ না করেও নতুন করে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন ডিপার্টমেন্টে মাস্টার্স করার পেছনেও রয়েছে এক মজার কাহিনী। তখন সদ্য হলে উঠেছেন, হলের অন্য এক ছাত্র মোয়াজ্জেম-এর সাথে আব্দুল মতিনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরই জের ধরে আব্দুল মতিন তার লেপ, তোষক, বই ইত্যাদি নিয়ে নিচে ফেলে দেন। ফলশ্রুতিতে সে অভিযোগ করেন প্রভোস্টকে। ইতিহাসের অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন ছিলেন সেই সময়ের ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট। তিনি আব্দুল মতিনকে ডেকে নিয়ে জেরা শুরু করলেন। আব্দুল মতিন প্রত্যেকটি প্রশ্নের বাংলা উত্তর দিচ্ছিলেন কিন্তু প্রভোস্ট বাংলা বুঝতেন না। তিনি অনুরোধ করেন ইংলিশে উত্তর দিতে কিন্তু আব্দুল মতিনের সোজাসাপ্টা উত্তর- বাংলা তাঁর মাতৃভাষা, তাই প্রতিটা জবাব তিনি মাতৃভাষায়ই দিবেন। প্রভোস্ট তাই উপায়ান্তর না দেখে আব্দুল মতিনের সাথে আপোষ করেন। আব্দুল মতিনকে নির্দোষ ঘোষণা করেন এবং সেই সাথে আব্দুল মতিনের তারুণ্যকে। সম্প্রতিভ উত্তর, জড়তাহীন কথা বলা, আত্মবিশ্বাস, সাহসিকতা-সব মিলিয়ে আব্দুল মতিনের উচ্ছলতা, তারুণ্যে ভরপুর প্রাণ ড. মাহমুদ হাসানকে অভিভূত করেছিল। ড. মাহমুদ হাসান এই তরুণ সম্ভাবনাময় ছেলেটিকে প্রস্তাব দিলেন মাস্টার্স পড়ার জন্য। আব্দুল মতিন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন তা কিভাবে সম্ভব! কিন্তু ড. মাহমুদ হাসান এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন। সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত এই কাজটি তিনি করলেন দীর্ঘ বিচার, যুক্তি, প্রমাণ ও শর্ত সাপেক্ষে। সেই সময়ের ভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলস ড. মোয়াজ্জেম হোসেনের সহায়তায়। আব্দুল মতিনের সততা, বিশ্বস্ততা. সংবেদনশীল মন, দৃঢ়তা সবকিছু মিলে প্রতিভার স্ফূরণ তাঁকে সাধারণের ভিতরে অসাধারণ করে তুলেছিল। ড. মাহমুদ হাসানের কাছে তাই তিনি অনেকটা কৃতজ্ঞ। এরপরও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিভিন্ন সময়ে ভাষা আন্দোলনের সাথে নিজের সম্পৃক্ততার কারণে আব্দুল মতিনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এতকিছুর পরও এই অকুতোভয় বীর কখনো তাঁর কর্তব্য থেকে পিছপা হননি। কখনো বিকিয়ে দেননি নিজের সত্ত্বাকে। যা কিছু ভালো, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সত্য কেবল তার জন্যই তাঁর যুদ্ধ ছিল। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর মূল নীতি। এই সত্য সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বহুবার বহুভাবে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে হয়েছে। কখনোবা তিরস্কার শুনতে হয়েছে, কখনো শারিরীকভাবে নির্যাতিত হতে হয়েছে নির্মমভাবে। কিন্তু কোন কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। ভালো মন্দের সূক্ষ্ম বিচারবোধ যার ভেতর, ন্যায় অন্যায়ের পরিচয় যার জানা, সত্য-অসত্যের পার্থক্য যে চিনে তাঁকে কি টলানো সম্ভব? তিনি নিজের জীবন বোধকে সাধারণ লোভ, লালসা, মোহের অনেক উর্দ্ধে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন বলেই মধ্যবিত্ত সুখের পেছেনে ছুটে বেড়াননি। তিনি চেয়েছিলেন সত্যিকারের সুখ, সত্যিকারের শান্তি। আর তা হল আত্মার শান্তি, আত্মার সুখ। সত্য অন্বেষণের মাধ্যমে আত্মাকে পবিত্র করার সুখ।

ভাষা আন্দোলন ও আব্দুল মতিন
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস, দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে পাকিস্তান। কিন্তু কিছুদিন পরই নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে, একটি জাতি, যে জাতি এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সংখ্যা ও সক্রিয়তায় দিক থেকে মূখ্য ছিল তাদের ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করে, ভাষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এক মাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী শাসকদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র ছাড়া অন্যকিছু নয়। এবং তাদের এই চক্রান্ত ও যড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল বাংলার প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর, সচেতন মানুষেরা। বাঙালী জাতি তাদের অধিকার আদায় করে নিয়েছিল।

যৌবনে আবদুল মতিন।

ইংরেজ, কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে পাকিস্তানের জন্ম হয়। তখন বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশ বিভক্ত আকারে এবং আসামের কেবল সিলেট জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলা ও আসাম প্রদেশ বিভক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান হওয়ায় মুসলিম লীগের উপর এ দেশের মুসলমান জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পরে। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও অতি ক্ষীণ হলেও সন্দেহ দেখা দেয় মুসলিম লীগের উদ্দেশ্য সম্পর্কে। পাকিস্তানের উন্মেষ ও প্রতিষ্ঠার মুহুর্তে তারা প্রধানত মুসলমান ও স্বাধীন নাগরিক এই বোধে আচ্ছন্ন এবং সুন্দর, সুখী নিশ্চিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন বিভোর। তখনও বাঙালী জাতি প্রধানত বাঙালী তথা বাঙালী জাতিসত্তা বোধ সম্পন্ন জনসমষ্টি নয়। এই যখন অবস্থা, তখন পাকিস্তান অর্জনের মাত্র ৩ মাস পর নতুন প্রচলিত টাকা, ডাক টিকেট, এনভেলাপ, মানি অর্ডার ফরম ইত্যাদিতে বাংলা নেই। কেবল ইংরেজীর পাশাপাশি উর্দু আছে। এটা দেখে বুদ্ধিজীবী ছাত্ররা কেউ চুপ করে থাকল না। গর্জে উঠল তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠ উর্দুর পাশে বাংলা চাই। ছাত্র, সরকারী কর্মচারী ও বুদ্ধিজীবীরা সভা, মিছিল ঘেরাও ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে সোচ্চার হয়ে উঠল। এই তীব্র আকাঙ্খা থেকে তারা অনেকটা স্বতস্ফূর্তভাবে মন্ত্রীদের বাড়িতে চড়াও হতে লাগল। সেই সাথে সেক্রেটারিয়েট ও আইন সভার প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদেরও ছেড়ে দিলো না।

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে পৌছালেন। ২১ মার্চ ছিল সেই দিন যেদিন পাকিস্তানীদের নোংরা যড়যন্ত্রের মোড়ক উন্মোচিত হয়। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর কুত্‍সিত চিন্তা প্রকাশিত হয় মোহাম্মদ আলী জিন্নার সেই বৈষম্যমূলক ঘোষণার মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। রেসকোর্স ময়দানে দশ হাজার মানুষের সেই বিশাল জনসমুদ্রে জিন্নার এই ঘোষণায় সমগ্র জাতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়ার আভাস ষ্পষ্ট ছিল। অতিকায় এক হতাশা এসে ভর করে বাঙালী জাতির ওপর।

সেই বিশাল জনসভায় আব্দুল মতিনও উপস্থিত ছিলেন। সকল জনসাধারণের সাথে তাঁর সত্ত্বা, মন, প্রাণ সর্বশরীর প্রতিবাদ করে ওঠেছিল এই ঘোরতর অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আব্দুল মতিন তাত্‍ক্ষণিকভাবে দ্বিমত প্রকাশ করে জোর আপত্তি জানাতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন। তিনি সাময়িকভাবে নিজেকে সংযত করলেও মানসিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করলেন পরবর্তী ২৪ তারিখের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের জন্য। জিন্নার সম্মানার্থে মার্চের ২৪ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠান করা হয়। কার্জন হলে আয়োজিত সেই সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও জিন্নার কণ্ঠে একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। আব্দুল মতিন সেখানে গ্র্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট গ্রহণের জন্য উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এবার এই বিপুল সাহসের অধিকারী, বীর কণ্ঠ নিজের অধিকার বুঝে নিতে, স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে কুন্ঠাবোধ করেনি। সেই বজ্রকণ্ঠ ছিল তীক্ষ্ম আর ধারালো যা জিন্নার ষড়যন্ত্রের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

গ্রীষ্মের উত্তপ্ত দুপুরে যে শিশুটি মায়ের খোলা শীতল পিঠে কচি শরীর লেপটে দিয়ে ঘুমাতে পারেনি, যে শিশুটি বর্ষার তুমুল বর্ষণে মায়ের হাতের আদরে মাখা খিচুরী খেতে পারেনি, যে শিশুটি ঘোমটার ফাঁক গলে চেয়ে থাকা মায়ের শুভ দৃষ্টি নিয়ে শরতের আকাশে ঘুড়ি উড়াতে পারেনি, যে শিশুটি কনকনে শীতের রাতে মায়ের বুকের উষ্ণতা নিতে পারেনি-মায়ের অনেক আদরের সেই শিশুটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে যখন আর এক মাকে – মাতৃভূমিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, সংকীর্ণ চিন্তা চেতনা ছিন্ন করে নিজেকে সম্পূর্ণ করেছে প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনায় তখন তাঁর মন আবার ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। এবার আর তিনি প্রতিবাদ না করে থাকতে পারলেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্টস বিল্ডিংয়ের আমতলা

তিনি কোনো রাজনৈতিক পার্টি বা দল, কোনো ছাত্র সংগঠন বা কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন না। তিনি প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনার সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখতেন। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সাধারণ ছাত্রের কন্ঠে যেমন তা প্রজ্জলিত হয়ে উঠেছিল। ছাত্র মতিনের এটাই ছিল পরিচয়-একজন প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার অধিকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র।

ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে আব্দুল মতিন নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। যে ভাষার সাথে মায়ের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো জড়িয়ে আছে তা কোন এক জিন্নার কথায় ধুয়ে মুছে ফেলা যায় না। আর তাই এ ভাষাকে রক্ষা করতে আব্দুল মতিন এমন আকুল হলেন। ১৯৪৯ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হল সচিব অধিদপ্তরের সামনে থেকে। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শোভা যাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। দুই থেকে ৩ মাসের জন্য তাঁর জেল হয়ে গেল। কিন্তু তাই বলে এই অকুতোভয় বীর কখনো বসে থাকেননি। তাঁর তরুণ তাজা টগবগে রক্তকে কেউ শিথিল করে দিতে পারেনি। আন্দোলনের যে ডাক তাঁর অন্তর থেকে পেয়েছিলেন, যে অনুপ্রেরণা তাঁর প্রাণে সঞ্চার হয়েছিল তা ছাপিয়ে কোন মিথ্যা, কোন ভয়, কোন অসত্য তাঁর মনে আশ্রয় পায়নি। সত্য অসত্য সুন্দর-অসুন্দরকে বিচার করার মত চিন্তা শক্তি তাঁর ছিল। আর ছিল অপার সাহস যা তাকে কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে দেয়নি।

‘আমার এ শিরা উপশিরা চকিতে ছিঁড়িয়া গেল ধমণীর নাড়ির বন্ধন, শুনেছিনু কান পেতে জননীর স্থবির ক্রন্দন- মোর তরে পিছু ডাক মাটি -মা- তোমার, ডেকেছিলো ভিজে ঘাস- হেমন্তের হিম মাস- জোনাকির ঝাড়, আমারে ডাকিয়াছিল আলোয়ার লাল মাঠ কঙ্কালের রাশি, আধো আলো- অর্ধেক আঁধারে মোর সাথে মোর পিছে এলো তারা ছুটে, মাটির বাটের চুমো শিহরি উঠিল মোর ধু ধু মাঠ- ধানখেত-কাশফুল-বুনোহাঁস-বালুকার চর বকের ছানার মতো যেন মোর বুকের উপর এলোমেলো ডানা মেলে মোর সাথে চলিল নাচিয়া।’

জীবনানন্দ দাসের এই কথাগুলো যেন আব্দুল মতিনের হৃদয়ে বেজেছিল। মায়ের ভাষাকে বিলীন করে দেবার ষড়যন্ত্রে কেঁদেছিল মা-মাটি। আর এই কান্না উদ্বেল করেছিল আব্দুল মতিনকে। মাটি-মাকে বাঁচাতে, মায়ের ভাষাকে বাঁচাতে আব্দুল মতিন তাই নিজের জীবনকে বাজি, রাখলেন। তুচ্ছ করলেন সকল সাধ আহ্লাদ পার্থিব সকল মোহ।

জেলে যাবার আগে তিনি সি.এস.এস. (Central Superior Service) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। একটি মাত্র বিষয়ে তিনি পরীক্ষা দিতে পেরেছিলেন। এরপর তাঁর জেল হয়। সরকার জেলারকে নির্দেশ দেন আব্দুল মতিনকে মুক্তি দিতে। এছাড়াও সি.এস.এস. এর মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। কিন্তু বিনিময়ে তাঁকে একটি বন্ডে সাইন করতে বলে। এই বন্ডে শর্ত হিসেবে থাকে পরবর্তীতে তিনি আর কোন আন্দোলনের সাথে জড়াতে পারবেননা। এই শর্ত মেনে নিয়ে বন্ডে সই করার মত কোন রুচিই আব্দুল মতিনের ছিল না। আর তাই পরম অবহেলা আর অবজ্ঞার সাথে এই প্রস্তাবকে তিনি প্রত্যাখান করতে দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি ইচ্ছা করলেই সেই বন্ডে সই করে সি.এস.এস. মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারতেন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি নিজের জীবনকে সুন্দর করে সাজানোর প্রলোভনকে তুড়ি দিয়ে ব্যক্তি স্বার্থ উড়িয়ে দিয়েছে। কারণ তিনি জানতেন এই লোভ উপেক্ষাকে প্রশয় দেয়া মানে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা। নিজেকে ছোট করা। এতে কখনো আত্মতৃপ্তি আসবে না। আর তাই তিনি এই বন্ডে সই করা থেকে বিরত থেকে অত্যাচার আর নিপীড়নকে নির্দ্বিধায় বরণ করে নিয়েছিলেন।

এরপর এক দিন দুই দিন করে দিন বয়ে গেল। অবশেষে জেলের মেয়াদ শেষ করে ২ মাস পর আব্দুল মতিন আবার তাঁর নিজের জীবনে ফিরে এলেন। কিন্তু এখানেও স্বস্তি নেই। ভাইস চ্যান্সেলর ড. মোয়াজ্জেম হোসেন তাঁকে তাঁর অফিসে ডেকে নিলেন এবং জেলের বন্ডের মতোই একটি বন্ডে সই করতে বললেন। কিন্তু শত আঘাতেও তাঁকে কাবু করা গেলনা। সুকান্তের মত করে বললেন-‘জ্বলে পুড়ে মার, ছারখার কর তবু মাথা নোয়াবার না।’ ড. মোয়াজ্জেম হোসেন কোনভাবেই মতিনকে বন্ডে সই করাতে পারলেন না। এর ফল তাত্‍ক্ষনিকভাবে পেলেন আব্দুল মতিন। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ৩ বছরের জন্য বহিষ্কার করলেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং হল থেকে। তাঁকে ফজলুল হক হল ছেড়ে দিতে হল। কিন্তু দমে যাবার পাত্র ছিলেন না আব্দুল মতিন। তিনি ইকবাল হলের বাঁশের ব্যারাকে থাকার ব্যবস্থা করে নিলেন। ১৯৫০ সালের মার্চের প্রথম দিকে। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় আব্দুল মতিন পুরাতন জাদুঘরের দক্ষিণ দিক ধরে হাঁটছিলেন। নিম্ন বেতনের সরকারী কর্মচারীদের ব্যারাকগুলির পাশে একটি চায়ের দোকান ছিল। সেখানে কয়েকজন কর্মচারী একান্তই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিল। সকালের নতুন সূর্যের আলো গায়ে মেখে তারা আলাপ করছিল ভাষা আন্দোলন নিয়ে। উত্কণ্ঠা, উত্সাহ, আশা আকাঙ্খা মেশানো কণ্ঠে তারা বলেছিল-ছাত্ররা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার জন্য সংগ্রাম শুরু করলেই তারা ঐ দাবীকে সমর্থন করে আন্দোলনে সামিল হতে পারে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হওয়া না হওয়ার উপরই নির্ভর করছে বাঙালী জাতির ভবিষ্যত। এই কথাগুলো আব্দুল মতিনকে যেন নতুন ভাবনার জায়গা তৈরি করে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন মানুষ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পাওয়ার জন্য আন্দোলনেও শরিক হতে চায়। আর আন্দোলন কারা করবে। নেতৃত্ব দিবে কারা, সে বিষয়েও তাদের কথায় সুষ্পষ্টতা ছিল। আর এভাবেই ভাষা আন্দোলন বিষয়ে আব্দুল মতিনের দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য বিষয়ক সচেতনতা তৈরি হয়। তিনি অনুধাবন করতে পারেন তাঁর করণীয় কি হওয়া উচিত।

এরই ভিত্তিতে ১৯৫০ সালের ১১ মার্চের এক জনসভায় এই সাহসী ও দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী আব্দুল মতিনের কণ্ঠে বেজে উঠেছিল সেই বাণী যা বঞ্চিত এই জাতির বহু কাঙ্খিত বহু প্রতীক্ষিত। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের এখন মাতৃভাষার রক্ষার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আর এই কাজটা ছাত্ররাই করতে পারে। প্রথমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকামী ছাত্রসংগঠনগুলিকে নিয়ে একটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করতে হবে। এই সংগ্রাম কমিটি দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুরূপ সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলবে। এবং ছাত্রদের সংগঠিত শক্তির মাধ্যমে আন্দোলনকে এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে যাতে জনগণ ধাপে ধাপে সামিল হতে পারে। এইভাবে ছাত্র ও জনগণের শক্তিতে আন্দোলন এমন দুর্বার হয় উঠবে যে শাসকরা মাথা নত করতে বাধ্য হবে।’ তাঁর এই প্রস্তাবমূলক বক্তব্যে সমবেত ছাত্ররাও ভাষা আন্দোলনের বিরাট সম্ভাবনা দেখতে পেলেন। এইভাবেই সাধারণ ছাত্রদের আকাঙ্খার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়েছিল। আর আব্দুল মতিন সেই কমিটির অন্যতম প্রধান হিসাবে গুরুত্বের সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এই সংগ্রাম কমিটি দুই মাস পরই পতাকা দিবস পালন করে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের পক্ষ থেকে কমিটির নামে করাচী অধিবেশনকালে গণপরিষদে স্মারক লিপি এবং তার প্রতিলিপি পাকিস্তানের সকল পত্রিকায় প্রেরণ, বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির সময় ছাত্রদের মাধ্যমে দেশব্যাপী অসংখ্য প্রচারপত্র বিলি, ১৯৫১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল প্রতিষ্ঠানে ১১ই মার্চ পালন, ১৯৫২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল প্রতিষ্ঠানে ১১ই মার্চ পালন, ১৯৫২ সালের ২৭শে জানুয়ারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের পল্টন ময়দানের জনসভায় কেবল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার উক্তির প্রতিবাদে প্রথমে ৩০শে জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও পরে ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ঢাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধর্মঘট পালন ও মিছিল, সভা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ পায়। এসব অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর অর্থের। আব্দুল মতিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অর্থ অভিযানের জন্য উদ্দীপিত করলেন এবং সেই সময় মাত্র ৩/৪ জন ছাত্রী মিলে আজিমপুর কলোনী থেকে ১ দিনেই ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সাধারণ জনগণের এরূপ সাড়া পরবর্তীতে তাদের কাজের জায়গাকে আরও স্বচ্ছ ও পরিষ্কার করে দিয়েছিল এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিটি কর্মসূচিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেছিল। ১৯৫০-৫২, এই ৩টি বছর আব্দুল মতিন ও অন্যান্য ছাত্ররা আন্দোলনকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে ও তাঁদের কর্মসূচিকে সফল করতে দেশের বিভিন্ন স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন। নিজের শরীর, খাওয়া, ঘুমের প্রতি কখনো মনোযোগ দেয়ার কথা মনে হয়নি। যে মহান দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় নিজ কাঁধে নিয়েছিলেন, যাকে তিনি নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেছিলেন তাকে সফল করতে তিনি আপ্রাণ সচেষ্ট ছিলেন। কোন হতাশা, ভয়, গ্লানি তাঁকে তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে পিছপা করতে পারেনি। তাঁর অসীম সাহসিকতায় ভরপুর মন সর্বদা তাঁকে দায়িত্ব পালনে সচল করে রেখেছে। আজকের যুগের আরাম আয়েশপ্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের মত নিজের সুখকে নিয়ে ভাবার সময় তখন তাঁদের ছিল না। আব্দুল মতিন তাঁর প্রেম ভালবাসা বিলিয়ে দিয়েছিল মানুষের জন্য, মায়ের ভাষার জন্য।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটি’র আহবায়ক হিসাবে আব্দুল মতিন ১৯৫২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে একটি মিটিং আহ্বান করেন। বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটি কতৃর্ক আহুত ছাত্র মিছিল শহর প্রদক্ষিণকালে সাধারণ মানুষ যে উত্সাহ ও উল্লাস ভরে তাদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছিল তার উপর ভিত্তি করে আব্দুল মতিন মনে মনে তাঁর কর্মসূচি নির্ধারণ করে ফেলেন।

শহর প্রদক্ষিণ শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যে জনসভা করা হয় সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্ব প্রদানকারী সাহসী বীর ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন আহ্বায়ক হিসাবে ২১শের সামগ্রিক কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণায় বলা হয়েছিলো দেশব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহে ধর্মঘট পালিত হবে; ঐ দিন সকাল দশটায় ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের ছাত্রছাত্রীরা প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জমায়েত হবেন, সেখান থেকে মিছিল করে তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে (বর্তমানে যেখানে শহীদ মিনার অবস্থিত) জমায়েত হবে। তারপর মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণ থেকে মিছিল করে ছাত্ররা আইন পরিষদ ভবনে যাবে। ৪ঠা ফেব্রুয়ারীর ছাত্র সভায় সর্বসম্মতভাবে এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ২১ শে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০ তারিখ রাতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কিনা সে বিষয়ে একটা মিটিং আহ্বান করা হয়। প্রাক্তন মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারী আবুল হাশেমের সভাপতিত্বে এই মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। মিটিং-এ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে ছিলেন চারজন। এরা হচ্ছেন গোলাম মাওলা, আব্দুল মতিন, ওলি আহাদ ও শামসুল আলম। বিপক্ষে ছিলেন ১১ জন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শামসুল হক। এই দ্বৈত মতের প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয় যে একুশ তারিখ জনসভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে বক্তব্য রাখবেন আব্দুল মতিন এবং বিপক্ষে বক্তব্য রাখবেন শামসুল হক। ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ঘোষিত ও বলবত্‍ থাকা সত্ত্বেও ঢাকা শহরের ২০/২২ হাজার ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়েছিল। ছাত্রদের অতি প্রিয় গাজিউল হকের সভাপতিত্বে সকাল ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সভা শুরু হয়। প্রথমেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য শামসুল হক সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ট ভোটে গৃহিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার প্রস্তাব নানা যুক্তিসহ ছাত্রদের অনুমোদনের জন্য উপস্থিত করেন। ছাত্ররা ধৈর্য সহকারে তাঁর কথা শুনল কিন্তু গ্রহণ করল না।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা মিছিল

এরপর সভাপতির আহ্বানে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সংখ্যালঘুদের এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির মুখপাত্র হিসেবে আব্দুল মতিন ৪ঠা ফেব্রুয়ারীর সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২১শে ফেব্রুয়ারীর এই সভা, সভা শেষে মিছিল সহকারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে জমায়েত হওয়া সেখান থেকে আইন পরিষদ ভবনে গিয়ে আইন পরিষদকে দিয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাশ করানো এবং সেই প্রস্তাবকে ভিত্তি করে দেশব্যাপী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার পদক্ষেপগুলিকে শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও বাস্তবায়িত করার আহ্বান জানান। সংখ্যাগুরুর মতের বিরুদ্ধে এবং প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সম্মুখে রেখেও আব্দুল মতিনের কণ্ঠে দৃঢ়তার সাথে সেই সময়ের করণীয় বিষয়গুলো ঘোষিত হয়েছিলো। তাই তিনি অকুন্ঠ চিত্তে, নির্ভয়ে দ্বিধাহীনভাবে দুর্বার শক্তি সঞ্চিত করে বলেছিলেন, ‘সঠিক এবং মহান কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা সম্ভব। কিন্তু সে সঠিক ও মহান কর্মসূচির অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটবে যদি আমরা স্বৈরাচারী শাসকদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে আরোপিত ১৪৪ ধারা মেনে নেই। সুতরাং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনকে জয়যুক্ত করার জন্য আমাদের কর্তব্য হবে ১৪৪ ধারা অমান্য করা।’ আব্দুল মতিনের এই যুক্তিভিত্তিক বক্তব্যের জন্যই যেন ছাত্ররা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেছিল। তারা তুমুল করতালি দিয়ে তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন জানান।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সভাপতি ঘোষণা করেন পরবর্তী করণীয় হবে চারজনের লাইনে সুশৃঙ্খল ভাবে মিছিল বের করা। এইভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল রাস্তায় নেমে পরে। অসংখ্য কাঁদুনে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ, অগণিত গ্রেফতার সত্ত্বেও সমুদ্রের বিরামহীন ঢেউয়ের আকারে ছাত্ররা গ্রেফতার কৃত ছাত্রদের শুন্যস্থান পূরণ করতে করতে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম লড়াইতে বিজয়ের ফলে ছাত্ররা যেমন উচ্ছসিত ও উত্সাহিত হয়েছিল, তেমনি পরবর্তী ধাপে বিজয়ের প্রতিও তাদের আস্থা অর্জিত হয়েছিল এবং অন্যদিকে পুলিশ ও তাদের অভিভাবক এই বিজয়ের ফলে পরাজয়ের গ্লানিতে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে মেডিকেল কলেজে সমবেত ছাত্র-ছাত্রীরা যখন মিছিল করে দ্বিতীয় ধাপের অর্থাত্‍ আইন পরিষদ ভবনে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন মিছিল প্রতিরোধে ব্যর্থ ও নাস্তানাবুদ কর্তৃপক্ষ নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গুলি চালাবার নির্দেশ দেয়। মুষলধারে গুলিবর্ষণে অপ্রস্তুত বিক্ষিপ্ত ছাত্রদের বেশ কয়েকজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তরুণ তাজা, সতেজ প্রাণগুলোর এমন নিস্তেজ, নিথর শরীরগুলো দেখে অন্যান্যরা বুঝতে পারল কি ঘটেছে। বর্বর পাকিস্তান বাহিনী সেদিন তাদের নিষ্ঠুরতার স্বাক্ষর রেখে গেল। ঘটনাস্থলেই রফিক ও সালাম নিহত হয়, বরকত হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়াও অসংখ্য আহত ছাত্র-ছাত্রী মৃত্যু পথযাত্রী হয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকে।

আব্দুল মতিন এই পরিস্থিতিতে হঠাত্‍ করেই খুব অসহায় হয়ে পড়েন। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে হঠাত্‍ করেই যেন একরাশ হতাশার মেঘ এসে ভর করে। কিন্তু সেই অশুভ মেঘ কেটে যেতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। গুলিবর্ষণ ও বিপুল সংখ্যক ছাত্র আহত-নিহত হওয়ার সংবাদ দাবানলের মত শহরময় ছড়িয়ে পড়ে। অল্পক্ষণের মধ্যেই বিরামহীন ভাবে হাজার হাজার মানুষ সেই সব বীর ছাত্রদের দেখতে আসে যারা তাদের ভাষার জন্য জীবন বাজি রাখতে বিন্দু পরিমাণ দ্বিধাবোধ করেনি।

জনগণের এমন স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিক সমর্থন দেখে আব্দুল মতিন অভিভূত ও অনুপ্রাণিত হয়ে নব শক্তি অর্জন করেন। তাদেরই মধ্যে সাত্তার নামক একজন আব্দুল মতিনকে উত্সাহ দিয়ে বলেন, ‘২২শে ফেব্রুয়ারী অর্থাত্‍ পরের দিন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে গায়েবী জানাজার কর্মসূচি প্রচার করা হোক।’ মতিন ভেবে দেখলেন প্রস্তাবিত কর্মসূচিটি সঠিক, বাস্তবসম্মত ও সময়োচিত, তাই তিনি প্রস্তাবটি লিখিত আকারে দিতে বললেন।

সেই প্রস্তাবিত কর্মসূচি স্বাক্ষরের জন্য তিনি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুবের কাছে উপস্থাপন করেন। কিন্তু কাজী গোলাম মাহবুব ২১ ফেব্রুয়ারীর কর্মকান্ডকে ভুল ও হঠকারী হিসাবে আখ্যায়িত করেন এবং আব্দুল মতিন ও অন্যান্যদের দোষারোপ করে প্রচারপত্রের খসড়ায় স্বাক্ষর দিতে এবং আন্দোলনের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক রাখতে অস্বীকৃতি জানান।

২২শে ফেব্রুয়ারী গায়েবী জানাজার কর্মসূচি ঘোষণার ফলে সেক্রেটারিয়েট কর্মচারীরা কাজে যোগ না দিয়ে মিছিল করে সকাল ১০টার মধ্যে আগের দিনের গুলির ঘটনাস্থল মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গায়েবী জানাজায় সামিল হয়। ২২শে ফেব্রুয়ারীতেও ১৪৪ ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু জনতা তা ভঙ্গ করে গায়েবী জানাজাতে উপস্থিত হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছিল কেবল ছাত্র। কিন্তু ২২শে ফেব্রুয়ারীর মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে নিহতের জানাজার জামাতে অধিকাংশ ছিল সাধারণ মানুষ। ২১শে’র আন্দোলন সম্ভব হয়েছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্তের কারণে। ২২শের অভ্যুত্থান সম্ভব হয়েছিল গায়েবি জানাজার সিদ্ধান্তের কারণে। আর এ দু’টো সিদ্ধান্তই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির মাধ্যমে সাধারণ ছাত্রদের যার মূল নায়কের ভূমিকায় ছিলেন ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন। অসীম সাহসিকতার সাথে তিনি যদি এই সব ঝুঁকি গ্রহণ না করতেন তাহলে হয়ত আজকে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেতামনা। তাঁর সাহসিকতার কারণেই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিলো। মা-মাটির প্রতি তাঁর সেই অপার ভালবাসা, সূদুর প্রসারী চিন্তা-চেতনা, সিদ্ধান্তে অটল থাকার মত দৃঢ় মানসিকতা সবকিছু মিলে অনেক সাধারণ মানুষের ভেতর তিনি এক অসাধারণ মানুষ। যেন জ্বলজ্বলে নক্ষত্র হয়ে মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান দখল করে আছেন। আর তাইতো তিনি স্মরণীয় বরণীয়। ২৩শে ফেব্রুয়ারী সারারাত জেগে, যেখানে প্রথম পুলিশের গুলিতে অনেক তরুণ সতেজ সম্ভাবনাময় প্রাণ হারিয়ে গেল, সেই মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে মেডিকেলের ছাত্ররা একটি ‘শহীদ মিনার’ নির্মাণ করে। আবেগ জড়িত, তত্‍পর এই বিশাল দলের কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আব্দুল মতিন। অনেক ব্যথা, অনেক কষ্ট, হৃদয় ছেড়া হাহাকার দীর্ঘশ্বাস ইটের স্তরে স্তরে গেঁথে অবশেষে নির্মিত হল শহীদ মিনার।

এরপর ১৯৫২ সালের ৭ মার্চ, আব্দুল মতিন ঢাকায় একটি বাড়িতে অন্যান্য নেতাদের সাথে ভাষা আন্দোলন বিষয়ক একটি গোপন মিটিং-এ মিলিত হয়েছেন। ঐ দিন অন্যান্যদের সাথে পুলিশ আচমকা তাঁকেও গ্রেফতার করে। এক বছরের জেল হয়ে যায় তাঁর। কিন্তু সরকার জানত তাঁকে জেলে পুরে সমস্ত কর্মকান্ড বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই আব্দুল মতিনকে আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সরকার তাঁকে লন্ডনে ৩ বছরের একটি স্কলারশিপের লোভনীয় প্রস্তাব প্রদান করে। কিন্তু লোভ, মোহ, ভয় কোন কিছুই যে তাঁকে তাঁর দায়িত্ব থেকে কখনো টলাতে পারেনি। তাই অবলীলায় এই প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন। এরপর এক বছর জেলের ঘাণি টেনে ১৯৫৩ সালের ১৪ মার্চ তিনি মুক্তি পান।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা
১৯৫২ সালে কারাবাসের সময় আব্দুল মতিনের কিছু কম্যুনিস্ট নেতার সাথে পরিচয় হয়। এদের মধ্যে বাংলা অবিভক্ত প্রদেশের যশোরের প্রভিনশিয়াল কমিটির সদস্য কৃষ্ণ বিনোদ রায়ের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তিনি আব্দুল মতিনের তেজস্বী ও তুখোড় চিন্তা চেতনা এবং সেই সাথে সংগ্রামী মনোভাবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। আব্দুল মতিনকে তিনি কম্যুনিস্ট পার্টিতে সক্রিয় সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হতে আমন্ত্রণ জানান। আব্দুল মতিন বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং এভাবেই পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। জেল থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৫৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের কাউন্সিলে আব্দুল মতিনকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয়। তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচিত ২য় প্রেসিডেন্ট।
১৯৫৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর করাচিতে সমগ্র পাকিস্তানের ছাত্রদের সম্মেলনে অল পাকিস্তান স্টুডেন্ট কনভেনশন অনুষ্ঠিত হন। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আব্দুল মতিন এবং ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে স্কুল শিক্ষক কামরুজ্জামানকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসাবে সেখানে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু ইংরেজীতে পারদর্শিতার অভাব থাকায় কামরুজ্জামান আব্দুল মতিনকে পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে কথা বলার একতিয়ার প্রদান করেন। আব্দুল মতিন সেই কনভেনশনে পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ৩টি দাবী উত্থাপন করেন। প্রথমত, বাংলাদেশ একটি অখন্ড প্রদেশ তাই একে স্বায়ত্ত্বশাসন দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী জাতির ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা প্রদান করতে হবে। এবং তৃতীয়ত, এই দাবী এবং কর্মসূচিকে অস্বীকার করার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলীম লীগের অপসারণ। কিন্তু এই ৩টি দাবী ছাত্রদের মধ্যে তুমুল আলোড়ন তোলে এবং তারা এই দাবীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। পরবর্তীতে একটি মিটিং এর মাধ্যমে আব্দুল মতিন তার এই দাবীর পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরেন এবং এর বাস্তবতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত ৩ দিনের এই কনভেশনে আব্দুল মতিনের দাবীগুলো সকল ছাত্রদের কাছে সমর্থন লাভ করে।

১৯৫৪ সালে যুক্ত ফ্রন্টের নির্বাচনে আব্দুল মতিন নমিনেশন পান। কিন্তু এক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দির আপত্তি ছিল। তিনি তাঁকে বাদ দিয়ে দেন এবং অজুহাত হিসাবে বলেন আব্দুল মতিন বয়সে অনেক ছোট। আব্দুল মতিন মর্মাহত হলেও নির্বচনের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যান এবং যুক্তফ্রন্টকে জয়ী করতে সব রকমের প্রচেষ্টা চালান। তাঁর এই কর্মতত্পরতার ফল স্বরূপ, ১৯৫৪ সালে তিনি পাবনা জেলার কম্যুনিস্ট পাটির জেনারেল সেক্রেটারি হিসাবে নিযুক্ত হন। এরপর ১৯৫৭ সালে তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির একটি অঙ্গ সংগঠন হিসেবে জাতীয় কৃষক সমিতি নতুনভাবে সংগঠিত হয়। জাতীয় কৃষক সমিতির পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি হিসাবে আব্দুল মতিন নিযুক্ত হন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজে মনোনিবেশ করেন। তিনি সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সাথে নিজেকে সব সময় যুক্ত রেখেছেন। তিনি কৃষকদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে কৃষকদের দুঃখ দুর্দশা অনুভব করার চেষ্টা করেছেন। তিনি তাদের কষ্ট খুব ভালভাবে অনুধাবন করতে পারতেন কারণ তিনি নিজেকে তাদেরই একজন বলে মনে করতেন। এরপর ১৯৬৮ সালে তিনি চারু মজুমদারের পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিষ্ট পাটিতে যোগ দেন। চারু মজুমদার শেখ মুজিবরের নেতৃত্বে এবং মতাদর্শের ভিত্তিতে স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষপাতিত্ব করতেন না। তিনি শেখ মুজিবরের রক্ষী বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে একটি শক্তিশালী দল গঠন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আব্দুল মতিন নিজের চিন্তার সাথে চারু মজুমদারের চিন্তা ভাবনা মেলাতে ব্যর্থ হন।

এভাবে আব্দুল মতিন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু অবদমিত হয়ে বা অন্যায় কিছু মেনে নেয়ার মত মানসিকতা তাঁর ছিল না। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যখনই তাঁর মতের মিল হয়নি বা অন্যায় চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে তিনি কখনো আপোষ করেননি। তিনি প্রতিবাদ করেছেন, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন, প্রয়োজনে অন্যায়ের জায়গা ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছেন তবুও অন্যায়/মিথ্যার কাছে মাথা নত করেননি কখনো। আব্দুল মতিনের বাবা আব্দুল জলিল ও ভাই গোলাম হোসেন মনু ১৯৭১ এর যুদ্ধে পাক বাহিনীর হাতে নিহত হন। পরে ১৯৭৪ সালে অন্য ভাই আব্দুল গাফ্ফার ও তিন চাচাত ভাই রক্ষী বাহিনীর হাতে নিহত হন। এরপর ১৯৭২ সালে আব্দুল মতিন রক্ষী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং তাঁকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। এরপর দীর্ঘ ৫ বছর জেলে থেকে ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি মুক্তি পান। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আবার তিনি কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং নতুন করে আবার কৃষক সমিতি গড়ে তোলেন। আব্দুল মতিন ভাসানী পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পারিবারিক বিস্তৃতি
আন্দোলন সংগ্রামে আব্দুল মতিন এতোটাই জড়িত ছিলেন যে সংসার ধর্মপালন করার একটা বিষয় যে সমাজে প্রচলিত আছে তা কখনো তাঁর মনেই হয়নি। এভাবে জীবন থেকে যখন ৪০টি বছর চলে গেছে তখন হঠাত্‍ই নিজেকে বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ করে ফেলেন। গুলবদননেসা মনিকা নামে এক দুঃসাহসী মেয়ের সাথে তিনি নতুন সংসার জীবন শুরু করেন ১৯৬৬ সালে। মনিকা ছিলেন ফকির মোহাম্মদ মোল্লার চতুর্থ কন্যা। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার ফতেহ মোহাম্মদপুরের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন তারা। মনিকাও কম্যুনিস্ট পার্টির একজন সদস্য ছিলেন। মূলত গ্রামের পিছিয়ে পড়া মেয়েদের নিয়ে তিনি কাজ করতেন। ঈশ্বরদী স্কুল ও মিরপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে স্কুল শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি বিএভিএস নামে একটি সেবামূলক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। আব্দুল মতিন ও মনিকা ২টি মেয়ে সন্তানের গর্বিত পিতা-মাতা। বড় মেয়ে মাতিয়া বানু সুকু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনিস্টিটিউট থেকে অনার্স ও মাষ্টার্স করেছেন। ছোট মেয়ে মালিহা শুভন হোম ইকোনমিক্স কলেজের পুষ্টি বিভাগ থেকে অনার্স ও মাষ্টার্স করেছেন।

স্বরচিত গ্রন্থাবলী
আব্দুল মতিন এই দীর্ঘ জীবনে সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি কিছু বইও লিখেছেন। এই বইগুলো তাঁর চিন্তা, চেতনা, সত্ত্বাকে ধারণ করে চলেছে। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী-
২১ ফেব্রুয়ারি ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে: ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ শৈলজানা, পাবনা
গণ চীনের উৎপাদন ব্যবস্থা ও দায়িত্ব প্রথা: ১৯৮৫
ভাষা ও একুশের আন্দোলন, ঢাকা ১৯৮৬
ভাষা আন্দোলন কি এবং তাতে কি ছিল, নন্দন প্রকাশন, ঢাকা ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯
ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য: আব্দুল মতিন ও আহমদ রফিক, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ঢাকা ১৯৯১
বাঙালী জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা আন্দোলন, বুক পয়েন্ট ও সমাজ চেতনা পাবলিকেশন, ১৯৯৫
জীবন পথের বাঁকে বাঁকে; সাহিত্যিকা, ঢাকা ২০০৪।

পুরস্কার ও সম্মাননা
এক জীবনে আব্দুল মতিন দেশ ও দশের জন্য যে অবদান রেখেছেন তার মূল্যায়ন পুরস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়। তবুও কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি অনেক সম্মাননা অনেক পুরস্কার অর্জন করেছেন-

দৈনিক জনকণ্ঠ গুণিজন ও প্রতিভা সম্মাননা ১৯৯৮ : পুরস্কারস্বরূপ ১ লক্ষ টাকা, প্রতিমাসে অণুদান ৫ হাজার টাকা,
প্রবাসী বাঙালীদের উদ্যোগে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সংবর্ধনা, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০০,
একুশে পদক ২০০১,
বাংলা একাডেমি কর্তৃক ফেলোশিপ প্রদান, ২৮ ডিসেম্বর, ২০০১
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক সম্মাননা স্মারক, ২০০২,
ভাষা সৈনিক সম্মাননা পরিষদ, সিলেট কর্তৃক ৫০ বছর পুর্তি উপলক্ষে সংবর্ধনা প্রদান, ২০০২,
আহমদ শরীফ স্মারক পুরস্কার, ২০০৩,
জাতীয় প্রেসক্লাব কর্তৃক উন্নয়ন অর্থনীতি স্বর্ণপদক ২০০৪, ১৩ আগস্ট, ২০০৪,
শেরে বাংলা জাতীয় পুরস্কার, ২০০৪
মুক্তিযুদ্ধ গণপরিষদ কর্তৃক সম্মাননা, ১৪ মে, ২০০৫
দৈনিক আমাদের সময় কর্তৃক সম্মাননা, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৪৪তম সমাবর্তন উপলক্ষে একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক ‘ডক্টর অব ল’জ’ (সম্মানসূচক ডিগ্রি), ২০০৮,
ভাসানী স্মৃতি পুরস্কার, ২০০৮,
একুশে টিভির পক্ষ থেকে আজীবন সম্মাননা,
ভাষা সৈনিক চারণ সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহম্মদ স্মারক সম্মাননা, ২০১০,
ঢাকার ৪০০ বছর উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা রত্ন সম্মাননা, ২০১০,
মানবাধিকার ও পরিবেশ সোসাইটি (মাপসাস) কর্তৃক মাপসাস শান্তি পদক, ২০১০,
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ পুরস্কার, ২০১০,
মহাত্মা গান্ধি পিস অ্যাওয়ার্ড, ২০১০,
দৈনিক কালের কণ্ঠের আজীবন সম্মানা পুরস্কার, ২০১০।

উল্লেখিত পুরস্কার ছাড়াও তিনি অনেক পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁর এত বছরের বিশাল সঞ্চয় তিনি নব প্রজন্মকে দিতে চেয়েছিলেন। ‘হৃদয় আমার চায় যে দিতে কেবল পেতে নয়, বয়ে বয়ে বেড়াতে সে তার যা কিছু সঞ্চয়’ – রবীন্দ্রনাথের মত আব্দুল মতিনও তাঁর সঞ্চয় উজার করে দিয়ে এই বিশাল ইতিহাসকে আরও প্রাণ প্রাচুর্যময় করে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি সত্য ও প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে রচনা করেছেন বেশ কিছু গল্প।

মৃত্যু
দীর্ঘ জীবন সংগ্রামের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁকে প্রতিটি মুহুর্তে শরীরের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। বিভিন্ন রোগ ব্যাধি শরীরকে আক্রমণ করেছে। কিন্তু তাঁর চির তরুণ চির নবীন মনকে কখনো আক্রান্ত করতে পারেনি। ১৯৯৭ সালে জানা যায় যে তাঁর হার্টে ব্লক হয়ে গেছে। এজন্য তিনি কলকাতাতে চিকিত্সা নেন এবং ঐ সময় দিল্লীর স্কট হাসপাতালে তাঁর হার্টের বাইপাস সার্জারী করানো হয়। এই সব রোগ ব্যাধির সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে তাঁকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে ফেলতে হয়। শেষ বয়সে এসে যদিও তিনি সক্রিয়ভাবে কোন কিছুর সাথে জড়িত ছিলেন না তবুও তিনি সমাজ রাষ্ট্র থেকে নিজেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেননি। তিনি সবসময় প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে সত্য ইতিহাস পৌছে দিতে চেয়েছেন। সত্য, সুন্দর স্বপ্ন গড়ে দিতে চেয়েছেন।

আব্দুল মতিনের দান করা চোখে এখন আলোকিত ঢাকার ধামরাই উপজেলার সুয়াপুর ইউনিয়নের রেশমা নাসরিনের জীবন।

আব্দুল মতিন ২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর সকাল ৯টায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে দীর্ঘদিন তিনি একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদান করেন।

তথ্যসূত্র
জয়নাল আবেদীন, উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী ও বামধারার রাজনীতি, প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, বাংলাপ্রকাশ, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩, পৃষ্ঠা- ২২১ ও ২৪৩।
উইকিপিডিয়া
gunijan.org.bd

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *