মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী

মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, যিনি জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী নামে অধিক পরিচিত (সেপ্টেম্বর ১, ১৯১৮ – ফেব্রুয়ারি ১৬, ১৯৮৪), বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন। সততা, কর্মনিষ্ঠা ও সময়ানুবর্তিতার আদর্শ পুরুষ আতাউল গণি ওসমানী কখনও কোন ধরণের লোভ লালসার স্বীকার হননি। স্পর্শ করতে পারেনি কোন অসাধু পন্থা। দেশে গণতন্ত্রের বিকাশই ছিল তার আজীবন এক সাধনা। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এবং জাতির সংকটময় মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হয়ে দেশকে আশু ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। জাতির সংকটময় মুহূর্তে তার মতো জাতীয় নেতা শুধু সিলেটেই নয় সারা বাংলাদেশে বড় বেশি প্রয়োজন। তিনিই প্রথম ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর প্রতিষ্ঠাতা। যার সুনিপুণ রণকৌশল ও ধীরে চলো নীতি এদেশকে রক্ষা করেছিল এক মহাবিপর্যয়ের কবল থেকে। জেনারেল (অবঃ) এম এ জি ওসমানি এক বীর সেনানীর নাম । যিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছিলেন। 

জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। ছবিসূত্রঃ thedailystar.net

শৈশব
১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে তাঁর জন্ম। বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান, মা জুবেদা খাতুন। বাবার কর্মস্থল ছিল সুনামগঞ্জ। পৈতৃক নিবাস অবশ্য সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার দয়ামীরে। ওসমানী ছিলেন দয়ামীরের শাহ্ নিজামুদ্দিন ওসমানীর বংশধর। ধারণা করা হয় যে, হজরত শাহজালাল (রহঃ) যখন সিলেটে আসেন ১৩০৩ সালে, তখন যে ৩৬০জন আউলিয়া তাঁর সাথে এসেছিলেন, তন্মধ্যে অন্যতম ছিলেন শাহ্ নিজামুদ্দিন ওসমানী। বালাগঞ্জ থানার নাম বর্তমানে পাল্টে রাখা হয়েছে ওসমানী নগর। সাধারণ একটি পরিবারে অতি সাধারণ হয়েই জন্মেছিলেন ওসমানী, জন্মেই অসাধারণ ছিলেন, তা কিন্তু না। তিনি তাঁর কর্ম দিয়ে নিজেকে বরণীয় করে তুলেছেন, নিজ জীবনকে করে তুলেছেন লাখো মানুষের পাঠযোগ্য। দুই ভাই আর এক বোনের মাঝে ওসমানী ছিলেন সবার ছোট। বাল্যকালে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘আতা’। বর্তমানে তিনি ‘বঙ্গবীর’ নামেই অধিক পরিচিত। পাকিস্তান আর্মিতেও কিন্তু তাঁর একটা পরিচিত নাম ছিল; ‘Papa Tiger’।

ওসমানীর পিতা ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, পরবর্তীতে আসামের জেলা প্রশাসকও হয়েছিলেন তিনি। আসাম সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হওয়াতে ওসমানীকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে আসাম ও সিলেটের নানা স্থানে।

খান বাহাদুর মফিজুর রহমান যখন গৌহাটিতে কর্মরত, ব্রিটিশ-ভারতের তৎকালীন সময়ে আসামের গৌহাটির হোম সেক্রেটারি ছিলেন স্যার চার্লস রোডেন্স। তার সাথে বাঙালীর মানসিক দূরত্ব ছিল বেশ, কেননা বাঙালী ততদিনে বুঝে গিয়েছে, ব্রিটিশরা প্রতিনিয়ত শাসনের নামে শোষণ করে চলেছে তাদের। চার্লস রোডেন্সের সময়েই গৌহাটির সাবডিভিশনাল অফিসার ছিলেন খান বাহাদুর মফিজুর রহমান। তাদের দুজনের ছেলে-মেয়ের মাঝেই ছিল ঘনিষ্ঠতা। তারা সারাক্ষণই দুরন্তপনায় মেতে থাকতো, অনেক সময় দুপুরের নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে। বাড়ির ছোট ছেলের অনিয়ম নিয়ে ওসমানীর বাবা-মাও তাঁকে তেমন কিছু বলতো না, কারণ ওসমানী ছোটবেলা থেকেই ছিল পড়াশোনায় দুর্দান্ত মনোযোগী। তাঁর বাবা-মা বিশ্বাস করতেন যে, এই ছেলে একদিন বড় কিছু করবে।

শিক্ষাজীবন
ওসমানী তাঁর শিক্ষাজীবনে খুবই মনোযোগী ছিলেন। তার প্রমাণ হলো স্কুলের প্রত্যেক পরীক্ষায় প্রথম হতেন তিনি। সেই সাথে গৌহাটিতে পেয়েছিলেন সমৃদ্ধ এক শৈশব। ১৯২৩ সালে গৌহাটির কটনস স্কুল অব আসামে শুরু হয় প্রাথমিক শিক্ষা।

১৯৩২ সালে তিনি সিলেট গভর্নমেন্ট পাইলট হাই স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে। সমগ্র বৃটিশ ভারতে তিনি প্রথম হন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে প্রিটোরিয়া পুরস্কার প্রদান করেছিল। এই অ্যাওয়ার্ডটি প্রদান করা হয় সমগ্র ভারত উপমহাদেশে ইংরেজি বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির জন্য। ১৯৩৮ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন তিনি। স্নাতক শেষ করেই আবেদন করেন সেনাবাহিনীতে যোগাদানের জন্য। ১৯৩৯ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেন তিনি। ওসমানীর বাবা ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভেন্ট, তাই তিনিও চেয়েছিলেন সেই সময়ের এত সম্মানীত পেশায় পিতার পথেই হাঁটবে পুত্র। কিন্তু ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পাশ করা ওসমানী সিদ্ধান্ত নিলেন সৈনিকের জীবনকেই বেছে নিবেন তিনি। ধারণা করা হয় যে, সমগ্র জীবনে শুধু মাত্র এই একবারই ওসমানী তাঁর বাবার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তিনি ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সার্ভিসের জন্য সিলেক্ট হয়েও এই রাজকীয় এক জীবনকে পেছনে ফেলে বেছে নেন একজন সৈনিকের কঠোর জীবন। এই হলেন আমাদের ওসমানী।

ওসমানী যখন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে যান, ইন্টারভিউতে একজন বোর্ড মেম্বার প্রশ্ন করেছিল, “আপনি কি মনে করেন, আপনার উচ্চতা একজন সৈনিকের জন্য যথোপযুক্ত?” বলাবাহুল্য যে, ওসমানীর উচ্চতা খানিক কমই ছিল, তিনি এই প্রশ্নের জবাবে বলেন যে, “যদি হিটলারের মতো মানুষ এই পুরো পৃথিবী নাড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে আমি কেন পারব না?” বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নির্ধারণ কমিটির সকলেই ওসমানীর আচরণে অভিভূত হয়ে যায়, সেই বছরেই জুলাই মাসে সিভিল সার্ভিসের যোগদানের সুযোগ বাদ দিয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ওসমানী।

কর্মজীবন
১৯৩৯ সালে তিনি রয়্যাল আর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। দেরাদুনে ব্রিটিশ ভারতীয় মিলিটারি একাডেমীতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন কমিশন প্রাপ্ত অফিসার হিসেবে। ১৯৪১ সালে ক্যাপ্টেন এবং ১৯৪২ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। তৎকালীন সময়ে তিনিই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ মেজর। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই তিনি এক ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হয়ে যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি ব্যাটেলিয়নের কমান্ডর হিসেবে তিনি বার্মা সেক্টরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তিনি আত্মনিয়োগ করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী গঠনে। এ সময়ে তিনি উন্নীত হন লেফটেন্যান্ট কর্ণেল পদে। ১৯৪৭ সালকে উপযুক্ত সময় মনে করে বঙ্গবীর ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠায় জেনারেল অকিনলেকের পেছনে নাছোড়বান্দা হয়ে লেগে থাকেন। সময় বুঝে বারবার অকিনলেকের কাছে বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রস্তাবণার কথা তোলেন তিনি। এই ব্যাপারে তিনি বলেন, “যেহেতু দেশ বিভাগ, ডকুমেন্টস ভাগাভাগি, সরকার গঠনসহ যাবতীয় ব্যবস্থা আপনাদের সহযোগিতায় হচ্ছে; সেহেতু অনুগ্রহ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যাতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠিত হয়, তার ব্যবস্থা করে দেবেন।”

জেনারেল অকিনলেক তখন দুটো চিঠি লিখেন। একটি লিখেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নার কাছে, অপরটি পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল গ্রেসির কাছে। চিঠিতে তিনি অনুরোধ করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠনের প্রস্তাবনার কথা। অবশেষে ওসমানী প্রস্তাবনায়, জেনারেল অকিনলেকের অনুরোধে পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলায় পিএনজি গঠন স্থগিত রেখে বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করে। এই ঘটনাটি উল্লেখ করলাম, কারণ ১৯৫১ সালে লে. কর্ণেল ওসমানী উদ্যোগী হয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হয়ে পূর্ব বাংলায় আসেন আর আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তিই ছিল ওসমানীর গড়া সেই বেঙ্গল রেজিমেন্ট। বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে পূর্ব বাংলায় এসেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রাম সেনানিবাস। ১৯৫৭ সালে তিনি উন্নীত হন কর্ণেল পদে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি প্রথমবারের মতো সামরিক পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ওসমানী ছিলেন একজন সৎ, আদর্শবান ও নিষ্ঠাবান সৈনিক। বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করেও কর্মে নিঃস্বার্থ ও নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। সামরিক বাহিনীর সুনাম ও খ্যাতির চেষ্টায় আপ্রাণ পরিশ্রম করতেন তিনি। ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঐতিহ্য রক্ষায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। তিনি মাত্র দু’টি ব্যাটালিয়ন থেকে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সংখ্যা ছয়টিতে বৃদ্ধি করেন। এতে বাঙ্গালীর সংখ্যা ২ থেকে ১০ এর অধিক করা এবং বাঙ্গালীদের জন্যে নির্দিষ্ট সংখ্যা অনুপাতে কমিশন ও অফিসার পদসহ সর্বস্তরে বাঙ্গালী সিনিয়রদের জন্য পদ সংরক্ষণ করেন।

তিনি কাজী নজরুল ইসলামের জনপ্রিয় বাংলা কবিতা “চল চল চল” কে পাকিস্তান ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মার্চ সঙ্গীত হিসেবে অনুমোদন লাভ করান। বেঙ্গল রেজিমেন্টের পুরোটাই গড়ে উঠেছিল তাঁরই নিরলস চেষ্টায়। বাঙ্গালী সেনাবাহিনীর প্রতি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর আচরণে ও ব্যবহারে তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলেন। সামরিক বাহিনী থেকে প্রথমবার অবসর গ্রহণ করার পর ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের মন্ত্রীসহ উচ্চ পদের প্রস্তাব পেয়েও গ্রহণ করেননি তিনি।

মুক্তিযুদ্ধপূর্ব রাজনীতি
সামরিক বাহিনী থেকে ওসমানী অবসর গ্রহণের পর জীবনের এই পর্যায়ের সূচনা ১৯৭০ সালে। এ বছর তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। গড়পরতা মানুষের মতো স্ত্রী সন্তান নিয়ে সৌখিন অবসর জীবন তিনি পাননি। কারণ যুদ্ধ বিগ্রহ আর পেশাগত জীবনে নিজেকে এমনভাবে বিলিয়ে দিয়েছিলেন যে, বিয়ে করার সময় হয়ে ওঠেনি তাঁর। তিনি নিজেও অবশ্য এ ব্যাপারে আফসোস করেননি। তিনি ভাবতেন, একজন সৈনিককে সৌখিন জীবন মানায় না। রাজনীতিতে নেমেই পেলেন ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনকারী ১৯৭০ এর নির্বাচন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সিলেটের চারটি থানা নিয়ে গঠিত উভয় পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ নির্বাচনী এলাকা থেকে জয় লাভ করে তিনি জাতীয় সংসদে আসন লাভ করেন।

যুদ্ধকালীন পর্যায়
২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকাতেই ছিলেন ওসমানী। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বছর চারেক আগে অবসর নেয়া ওসমানীর সামরিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতা সম্পর্কে পারিস্তান সরকার অবগত ছিল। তাই ঐ রাতেই ওসমানীকে হত্যার চেষ্টায় হন্যে হয়ে খোঁজে পাকবাহিনীর এক কমান্ডো। কিন্তু একেবারেই ভাগ্যগুণে অনেকটা অলৌকিকভাবে প্রাণ বেঁচে যায় ওসমানীর। এত পরিচিত চেহারা নিয়ে তিনি নিরাপদে পালিয়ে ছিলেন, সেটাও আমাদের আশ্চর্য করে। পরবর্তীতে মনজুর আহমদ নামক এক ব্যক্তির সাক্ষাৎকারে এই ব্যাপারে তিনিই খোলাসা করেন, বলেন যে, হানাদার পাকিস্তানী সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর বিখ্যাত গোঁফ জোড়াটি কামিয়ে ফেলেছিলেন। ঢাকা থেকে তিনি পালিয়েছিলেন ২৯শে মার্চ। এর আগের চারদিন ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফাঁকা বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। খানসেনারা তাঁকে খ্যাপা কুকুরের মতো খুঁজছিল। তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে চালিয়েছিল হামলা। প্রতিটি ফাঁকা ঘরেই মেশিনগান চালিয়েছে। নিউ ইস্কাটনের বেশ কয়েকটি বাড়িতেও তারা হামলা চালিয়েছিল, কিন্তু ওসমানী যে বাড়িতে ছিলেন, সেটায় হানা দেয়নি। এ ব্যাপারে ওসমানী উল্লেখ করেন, “পরম করুণাময়ের অশেষ অনুগ্রহ ছিল তাঁর ওপর। তা না হলে এমনভাবে কজন রক্ষা পায়!” ২৯শে মার্চ, নদীপথে পালিয়ে গিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধরত ব্যাটালিয়নের সাথে যোগ দেন তিনি। শুরু হয় ওসমানীর জীবনের নতুন এক অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পাক-ভারত যুদ্ধের পর এবার শুরু হয় নিজের মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার যুদ্ধ; যা ছিল স্বজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। নিজের সবটুকুই বিলিয়ে দেন তিনি এই যুদ্ধে।

৯ই এপ্রিল, ১৯৭১; ওসমানী সিলেটে যান মুক্তিবাহিনীর অবস্থান জানতে। সেখানে তিনি এম. আজিজুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এম. আজিজুর রহমান, তিনি ওসমানীর সাথে কাজ করার সময়ের কিছু অভিজ্ঞতা উল্লেখ করেন। তারই বিবৃতিটি সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে উল্লেখ করা হলো।

বঙ্গবীর জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীর ব্যাপারে মানুষ খুবই কম বিবৃতি প্রদান করেছে। এমনকি তারাও তাঁকে স্মরণ করেনি যারা স্বাধীন বাংলায় জেনারেল ওসমানীর কঠোর পরিশ্রমের ফল ভোগ করছে। জেনারেল ওসমানী; তাঁর নামটাই শত্রুবাহিনীসহ সকল বাঙালী অফিসারকেও শঙ্কিত করে তুলতো, এমন কোনো ঘটনাস্থল ছিল না কিংবা এমন কেউ ছিল না যার সমূহ বিপদ ছিল আর ওসমানী সেখানে হাজির হননি। কিন্তু বর্তমানে তাঁর নামে শ্রদ্ধায় মানুষ মাথা নোয়াচ্ছে, এমনটা দেখাই যায় না। একজন সফল নেতার যে সকল গুণাবলি থাকা প্রয়োজন তাঁর মাঝে সবই ছিল।

মাস্টার্স সমাপ্তির আগেই তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের জন্য একজন ক্যাডার মনোনীত হন। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে তিনি যোগ দেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে। জেনারেল ওসমানীর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৭১ সালের ৯ই এপ্রিল। আমি আমার দলকে নিয়ে সুরমা নদীর তীরে কীন ব্রিজের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থান করছিলাম। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে চলছিলো ভারী গোলাবর্ষণ। সেই সাথে আকাশপথেও পাক বিমানবাহিনী গোলাবর্ষণ চালায়। সুরমা নদীতে সেদিন শুধু মৃতদেহ ভেসে যাচ্ছিল। তরুণ ক্যাপ্টেন হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল ফ্রন্ট লাইনে সৈন্যদের সাথে যোগাযোগ করে। সেটা করারই চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পথিমধ্যে শত্রুদের গুলিতে আমার জীপ অচল হয়ে পড়লে জল্লারপাড় মসজিদের কাছাকাছি আমি লাফ দিয়ে পড়ি। এক অর্ধনির্মিত দালানের ছাদে গিয়ে উঠি। ছাদ থেকে বেশ ভালোমতোই আমি দেখতে পাই চারপাশের অবস্থা। হঠাৎ এক দৃঢ় কণ্ঠ আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে যে, ওহে যুবক, কী চলছে এখানে? তখনও আমি জানিনা যে, তিনিই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্ণেল ওসমানী (যুদ্ধ পরবর্তীতে তিনি জেনারেল পদে উন্নীত হন), আগে কখনো দেখা হয়নি তাঁর সাথে। আমি কল্পনাও করতে পারিনি কখনো, ওরকম ছোট দৈহিক গঠনের একজন আগন্তুক, যার পরিচয়, তিনি এই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি, তাঁর অত সাহস আর কৌতূহল যে, যুদ্ধের খোলা ময়দানে এভাবে একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁকে অনেক লম্বা পথ হেঁটে আসতে হয়েছে আমার কাছে আসার জন্য। তিনি পরিস্থিতির বর্ণনা শুনে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেন আর খুব দক্ষতার সাথেই পুরো পরিস্থিতি নিজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।

ওসমানী সাহেবের সাথে পরবর্তীতে আমার দেখা হয় ভারতীয় বর্ডারে অবস্থিত খোয়াই হাসপাতালে। আমি তখন শেরপুরের যুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ওসমানী ফ্রন্ট লাইনে আমার খবর শুনে তৎক্ষণাৎ সেখানে আসেন। আমার অবস্থা আর চিকিৎসা ব্যবস্থার অবহেলা লক্ষ্য করে সাথে সাথে নিজ হেলিকপ্টারে করে আগরতলায় এক হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান। কেমন অসাধারণ বীরত্বপূর্ণ একজন নেতা ছিলেন ওসমানী, সেই ব্যাপারে উল্লেখ করতে হলে এই দুটো ঘটনাই আমি মনে করি যথেষ্ট। একজন অফিসার গুটি গুটি পায়ে একদিন জেনারেল পদে ঠিকই উন্নীত হতে পারেন, কিন্তু সকল জেনারেল ভাল নেতা হতে পারে না। জেনারেল ওসমানী ছিলেন তেমনি একজন নেতা। আর আমাদের ভাগ্য ভাল ছিল, মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে আমরা পেয়েছিলাম জেনারেল ওসমানীকে।”

জেনারেল ওসমানীর বিখ্যাত গোঁফ, যার জন্য তিনি পাকিস্তান সরকার থেকে মাসিক ভাতা পেতেন। ছবিসূত্রঃ Wikimedia Commons

১৯৭১ সালের ১১ই এপ্রিল, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাষণ দেন। এই সময় তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের কথা, সেই সাথে বলেন যে সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হবেন এম. এ. জি. ওসমানী। এর পরপরই ১৭ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার, ওসমানীকে করা হয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। তাজউদ্দিন আহমদের এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মেজর জেনারেল কে. এম. সফিউল্লাহ্ বলেন, “আমরা যে বিষয়টি আগেই অনুমান করেছিলাম তাই সঠিক হলো। কর্ণেল এম. এ. জি. ওসমানীকে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ঘোষণা। এর ফলে প্রত্যাশিত ও শুভ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়।” (আমাদের মুক্তিযুদ্ধ- মেজর কে. এম. সফিউল্লাহ্)

তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এক একজন সেনাবাহিনীর অফিসারকে নিয়োগ দেয়া হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মাঝে সমন্বয় সাধন করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ রাখা, অস্ত্রের যোগান নিশ্চিত করা, গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি কাজ সাফল্যের সাথে পালন করেন ওসমানী। অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন সেক্টরগুলো পরিচালনা করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর রণকৌশল ছিল শত্রুকে নিজেদের ছাউনিতে আটকে রাখা এবং তাদেরকে যোগাযোগের সবগুলো মাধ্যম হতে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। কিন্তু মে মাসের দিকে তাঁর মনে হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম সংখ্যক সৈন্য নিয়ে শত্রুকে ছাউনিতে আটকে রাখা গেলেও ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়টি তিনি সরকারকে জানিয়ে যুদ্ধে সম্পূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন নিয়ে আসেন। প্রাক্তন ইপিআর এর বাঙালী সদস্য, আনসার, মোজাহেদ, পুলিশ বাহিনী ও যুবকদের নিয়ে গঠন করেন গেরিলা বাহিনী। তাঁর হাতে কোনো নৌবাহিনী ছিল না। তবে নৌবাহিনীর কিছু অফিসার নিয়মিত তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখতেন। তাছাড়া ফ্রান্সের জলাভূমিতে থাকা পাকিস্তানের সাবমেরিনের কিছু সংখ্যক কর্মীও মুক্তিবাহিনীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতো। এম. এ. জি. ওসমানী এই সুযোগটিই কাজে লাগান, নৌবাহিনীর অফিসার আর কিছু গেরিলা সদস্য নিয়ে গড়ে তুলেন নৌ-কমান্ডো বাহিনী। আগস্টের মাঝামাঝিতেই তিনি সুষ্ঠু রণকৌশলের মাধ্যমে নদীপথে শত্রুর চলাচল প্রায় রুদ্ধ করে দেন। নৌবাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে একটা বড় ধরনের সঙ্কটের অবসান হলেও দেশ স্বাধীন হবার আগে আগে আরও একটা সঙ্কট ওসমানী অনুভব করেন। সেটা হচ্ছে তাঁর হাতে কোনো বিমানবাহিনী ছিল না। শেষ দিকে তিনি দুটি হেলিকপ্টার, একটি অটার ও তাঁর নিজের চলাচলের জন্য একটি ডাকোটা নিয়ে বিমানবাহিনী গঠন করেছিলেন।

সামরিক বাহিনীর কতিপয় অফিসার প্রশ্ন তুলেছিলেন, মুজিবনগরে বসে ওসমানীর পক্ষে এককভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করা কতটুকু সম্ভব? সেক্টর কমান্ডাররা নিজ নিজ সেক্টরে নির্দেশ প্রদানের অবাধ ক্ষমতা দাবী করেন। এ ঘটনায় ওসমানী মানসিকভাবে আহত হয়ে ১০ই জুলাই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের উপস্থিতিতে মুক্তিবাহিনীর প্রধানের পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন। পরে তাঁকে বলা হয়, পুরো ঘটনাটিই একটি ভুল বোঝাবুঝি ছিল। সেক্টর কমান্ডার এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে তিনি স্বপদে পুনর্বহাল থেকে যান।

পাকবাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর যৌথ কমান্ডের নিকট আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানী উপস্থিত না থাকার কারণ ছিল আর্মি প্রটোকল। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষে থেকে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্ব ফ্রন্টের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট জগজিৎ সিং অরোরা। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব ফ্রন্টের প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজী। এরা দুজনেই ছিলেন আঞ্চলিক প্রধান। অন্যদিকে ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান। তাই সেনাবাহিনীর প্রটোকল রক্ষার্থে কোনো সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক প্রধানের সাথে তিনি কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেন না।

কেন ওসমানীকে ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি, এ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। মার্কিন অধিদপ্তরের প্রকাশিত দলিলপত্রে দেখা যায় যে, ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ প্রসঙ্গে যে দাবীগুলো তুলেছিল, তাতে প্রথমেই ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তি। তৃতীয় নম্বরে বলা হয়, পাকিস্তানে অবস্থানরত সব বাঙালী সৈনিকের দেশে ফিরে আসার সুযোগ এবং ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করা। আগেই বলেছি যে, যৌথ কমান্ডের নেতৃত্ব ছিল অরোরার হাতে। ওসমানী কেন উপস্থিত থাকতে পারেননি, সেই ব্যাপারে তিনি কখনোই মন খারাপ করেননি, এ ব্যাপারে কোনো বিবৃতি কিংবা লিখিত দলিলপত্রও পাওয়া যায় না।

বাঙালীরা চেয়েছিল, পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে তাদেরই গৌরব, জেনারেল ওসমানীর নিকট। কিন্তু ওসমানী সেই আত্মসমর্পণে উপস্থিতই হতে পারেননি। সিলেট থেকে ঢাকায় আসার সময়ে তাঁর হেলিকপ্টারে ভারী গোলাবর্ষণ করা হয়, ফেঞ্চুগঞ্জের নিকটে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। যার কারণে তিনি সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি ঢাকায়। পরবর্তীতে ধারণা করা হয় যে, যৌথবাহিনীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, যারা আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের নীল নকশা করেছিল, তারা সচেতনভাবেই এই ঘটনাটি ঘটায়। কেননা হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয় ফেঞ্চুগঞ্জের কাছাকাছি স্থানে। উল্লেখযোগ্য তথ্যসূত্রমতে, ফেঞ্চুগঞ্জে অনেক পূর্বেই পাকবাহিনী মুক্ত করা হয়েছে। গুলাগুলিতে হেলিকপ্টারে থাকা লে. কর্ণেল এম. এ. রবের হাতে আর উরুতে গুলি লাগে, সেই সাথে ফুয়েল ট্যাংকেও লীক হয়। ওসমানী সেই লীক এড়াতে নিজের হাত চেপে ধরেন। হাত দিয়ে ধরে রেখে, গায়ের জ্যাকেট খুলে সেই জ্যাকেট দিয়ে চেপে ধরেন। হেলিকপ্টার ভূমিতে পতিত হওয়ার সাথে সাথেই এক ভারতীয় কর্ণেল সেখানে জীপ আর অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে উপস্থিত হয়। এই ব্যাপারটিও পরবর্তীতে অস্বাভাবিক মনে করা হয়, কেননা এত দ্রুত ঘটনাস্থলে কেবল তখুনি উপস্থিত হওয়া সম্ভব যদি পূর্ব থেকেই এ ব্যাপারে জানা থাকে। তৎকালীন সময়ে কোনো সরকারই এই ঘটনার তদন্ত করার প্রয়োজন বোধ করেনি। ভারতীয়রা আরো একটি ঘটনা ঘটায়, তারা বেশ ভালমতোই জানতো খুলনাতে কোনো পাকিস্তানী জাহাজ অবস্থান করছে না। তবু ১০ই ডিসেম্বর, বিএনএস পদ্মা ও বিএনএস পলাশে গুলিবর্ষণ করে। এখানে উল্লেখ্য যে, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের মৃত্যু এই গুলিবর্ষণের মাঝে দিয়েই হয়।

এই গাড়িটিতে করেই জেনারেল ওসমানী ফ্রন্ট লাইনগুলোয় যাতায়াত করতেন।          ছবিসূত্রঃ Wikimedia Commons

যুদ্ধোত্তর পর্যায়
১৯৭১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সের জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়া হয় তাঁকে। ওসমানী তাঁর অকৃত্রিম দেশপ্রেমের স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন দু’ভাবে। আপামর জনসাধারণের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা, আর ১৯৭২ সালের ৭ই এপ্রিল, ওসমানীকে চার তারকাযুক্ত জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। একই সাথে জেনারেল পদটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ সরকার জেনারেল পদ বিলুপ্ত করে – সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী আর বিমানবাহিনীকে পৃথক করে দেয়। তিন বাহিনীরই পৃথক পৃথক প্রধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

১৯৭২ সালে মনজুর আহমদকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী বলেন যে, “যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো”- বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষণের অন্তরালে ছিল একটি সুচিন্তিত রণকৌশল। বঙ্গবন্ধুর এই আহবান সামরিক বাহিনীর বাঙালী সৈনিকদের কাছে ছিল বিরাট তাৎপর্যময়। বস্তুত এই আহবানকে তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত বলেই মনে করেন।” সাতই মার্চের ভাষণের সময়ই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার কথা ঠিক করে ফেলেছিলেন মনে মনে। তিনি শুধু সুযোগ খুঁজছিলেন, এখানেও আমরা তাঁর সুক্ষ্ম রণকৌশল টের পাই। তিনি কাউকেই মনের কথা জানতে দেননি। কিন্তু সাতই মার্চের ভাষণে কিন্তু ঠিক বলেছিলেন, “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু – আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।” ২৫মার্চের কালরাতে, অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁকে পরামর্শ দেন পালিয়ে নিরাপদ স্থানে আত্মগোপনের। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর মতো নেতার পালিয়ে বেড়ানো সুযোগ খুব কম। পাকিস্তানী বাহিনী এই সুযোগ তাঁকে মেরে ফেলতে পারে। তাই বাসায় থেকে ২৫ মার্চের কালরাতে মানে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণার বন্দোবস্ত করেন। তার কিছু সময়ে পরেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মনজুর আহমদ উল্লেখ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পরও জেনারেল ওসমানী সে রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়েছিলেন কিছুক্ষণের জন্য। কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে ছুটে এসেছিলেন। কিছু আলাপ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তারপরই আবার দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনিই ছিলেন নেতৃত্বস্থানীয় সর্বশেষ ব্যক্তি, যিনি সবার পরে এ বাড়ি ছেড়েছিলেন। তারপর কোথায় গা ঢাকা দিয়েছিলেন এই বীর সেনা, সে ব্যাপারে কেউ কিছু জানতো না।

১৬ই ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ সাল, মুক্তিবাহিনী আর প্রাক্তন ইপিআর সদস্য যারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়নি, এই দু’দল এক অঘোষিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে বর্তমান পীলখানায়। ওসমানীকে যদিও জানানো হয়েছিল, ভারী গোলাবর্ষণের দরুণ তিনি সেখানে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। গোলাগুলি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে যতক্ষণ না শেখ মুজিবুর রহমান নিজে ঘটনাস্তলে এসে হাজির হন। তিনি হাজির হয়েই ঘোষণা দেন যে, ইপিআর বাহিনীর পুরোটা নিয়েই হবে বিডিআর বাহিনী। সেই সাথে মুক্তিবাহিনীর মধ্য থেকেই তিনি তৈরি করবেন আরেক বাহিনী; জাতীয় রক্ষী বাহিনী।

যুদ্ধোত্তর রাজনীতি
পরাধীন বাংলাদেশে যখন স্বাধীনতা অর্জিত হলো, ওসমানী তখন জীবনের পাঁচ দশক অতিক্রম করে ফেলেছেন। ব্রিটিশ-ভারতে জন্ম তাঁর, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর পাকিস্তানের নাগরিক। অতঃপর ১৯৭১ সালে নিজের নেতৃত্বে সব শত্রু বিতাড়িত করে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন। জীবনের পাঁচ দশক অতিক্রম করা এই বঙ্গবীর কখনোই ভাবেননি যে, স্বাধীন দেশে তাঁর দায়িত্ব শেষ হতে চলেছে। সামরিক বাহিনীতে ছিলেন না, কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তাঁর অনেক দায়িত্ব বেড়ে গেছে, এমনটাই ভাবতেন তিনি। জীবনের সব অভিজ্ঞতা নিয়ে নেমে পড়লেন দেশ গঠনের কাজে। নিজের যোগ্যতা অথবা জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সুযোগ আসে প্রথমবারের মতো ১৯৭৩ সালে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে জেনারেল ওসমানী।

১৯৭৩ সালে, স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনে ওসমানী ৯৪ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হয়ে “ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়”-এর দায়িত্ব নেন। ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি যুগপৎ সংসদ সদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগ সদস্য পদ ত্যাগ করেন। সে বছরই ২৯শে আগস্ট রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমদ তাঁকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। কিন্তু ৩রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতার হত্যাকান্ডের অব্যবহিত পরেই তিনি পদত্যাগ করেন।

জীবনে কারো সাথে তিনি কখনো আপোস করেননি। আমরা তাঁরই জীবন থেকে দেখতে পাচ্ছি বেশ কয়েকবার পদত্যাগের ঘটনা, যখন কোন বিষয়ে তিনি মতের মিল খুঁজে পাননি, বেছে নিয়েছেন পদত্যাগকে। এমনি কঠোর আর দৃঢ় ছিলেন তিনি মানুষ হিসেবে। জীবনে কখনো পিছিয়ে থাকেননি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ব্যতীতে তাঁর জীবনে আর কোনো ব্যর্থতা নেই। যখন যাতে হাত দিয়েছেন, সফলতা ছিনিয়ে এনেছেন। এমন এক জীবন পরিচালনাকারীকে মনে হতেই পারে, তিনি হয়তো পড়াশোনায় সময় দিতে পারেননি, পড়াশোনা করেননি। কিন্তু এখানে ঘটনা উল্টো। কখনো কোনো পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় হননি। ম্যাট্রিকে সমগ্র ভারত উপমহাদেশে প্রথম স্থান অধিকার, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পর্যন্ত তাঁকে দমিয়ে রাখা যায়নি। এতদসত্ত্বেও তিনি বেছে নিয়েছেন একজন সৈনিকের জীবনকে। একে দৃঢ়তা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে।

১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওসমানী “জাতীয় জনতা পার্টি” নামে নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন।

এরপরেই শুরু হয় জেনারেল ওসমানীর জীবনের নতুন এক অধ্যায়। বীরদর্পে যে সৈনিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পাক-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সে সৈনিক চলে যান একেবারেই পর্দার আড়ালে। অনেক কলুষতার মধ্যে একেবারে স্বতন্ত্র চরিত্রের অধিকারী মানুষটি টিকতে না পেরে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি।

বলা হয় যে, ওসমানী একদম পুরোদস্তুর স্পার্টান সাম্রাজ্যের যোদ্ধাদের মতো সৈনিক ছিলেন। জীবনে কারো সাথে কোনো আপোস নেই, অতি সাধারণ জীবন, সাধারণ জামা-কাপড়, সাধারণ সৈনিকের খাবার, সেনাবাহিনী থেকে বরাদ্দকৃত আসবাবই ব্যবহারে করে এসেছেন বরাবর। এই হলেন জেনারেল ওসমানী, আমাদের ওসমানী।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য যে চার ধরণের সম্মাননা প্রদান করা হয়েছিল যোদ্ধাদের, তার প্রাথমিক তালিকা ওসমানী নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ আনা হয় যে, ওসমানী পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে এই তালিকাটি তৈরি করেছেন। ওই সময়ে তালিকা বাতিল ঘোষণা করা হলেও, পরবর্তীতে এই তালিকা অনুযায়ী বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বীক্রম আর বীর প্রতীক সম্মান ধারীদের নাম ঘোষিত হয়।

১৯৮২ সালে স্বৈরশাসক এরশাদ সামরিক আইন জারি করলে ওসমানী এর প্রতিবাদ করেন। এরপরেই তিনি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়ান।

জেনারেল ওসমানীর নামে প্রবর্তিত ডাকটিকিট।

স্বীকৃতি
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ধোপাদীঘির পাড়ে ওসমানীর পৈতৃক বাড়িটি পাকিস্তানী হানাদারেরা ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ শেষে তিনি নিজ উদ্যোগে বাংলো টাইপ ঘর নির্মাণ করেন সেখানে। ১৯৭৬ সালের ১৮ই মে এ বাড়ির ২ বিঘা জায়গা দিয়ে তিনি তাঁর বাবা-মায়ের নামে গঠন করেন জুবেদা খাতুন-খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্ট। এ ট্রাস্টের মাধ্যমে মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে ঢাকার ধানমন্ডির রোড-১০-এ, বাড়ি নং ৪২-এর সুন্দরবন নামক ওসমানীর নিজস্ব বাড়ির সম্পত্তি দিয়ে আর্তমানবতার সেবার লক্ষ্যে গঠন করা হয় ওসমানী ট্রাস্ট। এরশাদ সরকার ১৯৮৭ সালে সিলেটে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করে। সেই লক্ষ্যে, জুবেদা খাতুন-খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্টের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ৯৯ বছরের জন্য ধোপাদীঘির পাড়ের বাড়িটি লীজ নেয় সরকার। ১৯৮৭ সালে ৪ মার্চ এ বাড়িতে ওসমানী জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সেই থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় জাদুঘরের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে এটি।

তাঁর স্মরণে ঢাকায় গড়ে উঠেছে ওসমানী উদ্যান ও স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশ সচিবালয়ের বিপরীতে ওসমানী মেমোরিয়াল হল। সরকারী উদ্যোগে সিলেট শহরে তাঁর নামে একটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ওসমানী নগর থানার দয়ামীরে ওসমানী স্মৃতি যাদুঘর ও গ্রন্থাগার। বালাগঞ্জ উপজেলাকে ভেঙ্গে যে থানা ঘোষণা করা হয় তাঁরই নামে “ওসমানী নগর থানা”। নামকরণ করা হয়েছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। সিলেটে বঙ্গবীর রোডসহ অসংখ্য স্বীকৃতি স্থাপন করা হয়েছে।

১৯৮৩ সালে ৬৫ বছর বয়সে ওসমানীর ক্যান্সার ধরা পড়লে ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে ১৯৮৪ সালে তাঁকে লন্ডনের সেইন্ট বার্থোলোমিও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসার সমগ্র খরচ বাংলাদেশ সরকার বহন করে। লন্ডনে অধিকাংশ সময়ই তিনি তার ভাতিজা-ভাতিজীদের সাথে কাটিয়েছেন। ১৬ই ফেব্রুয়ারী তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

জেনারেল ওসমানীর টোম্বস্টোন।

মৃতদেহ দেশে নিয়ে এসে সম্পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটের দরগাহতে তাঁর মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়, এই ছিল তাঁর অন্তিম ইচ্ছা।

তথ্যসূত্র :
১. শত মুক্তিযোদ্ধার কথা
২. আমাদের মুক্তিযুদ্ধ – মেজর কে. এম. সফিউল্লাহ।
৩. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র (তৃতীয় খন্ড)
৪. মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান (অনির্বাণ ওসমানী-এর রচিয়তা)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *