মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুর

মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস সংগ্রহ- চাঁদপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
প্রকাশ: ২০১৬ সাল
বইটির লেখক: ডা. মো. দেলোয়ার হোসেন খান
তথ্য সংগ্রহ, সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন ও  প্রকাশক: এসিস্ট বাংলাদেশ।

 

মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুর গ্রন্থের মোড়ক

মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুর গ্রন্থটি ২০১৬ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশ হয়। গ্রন্থটির পরিবেশক: ত্রয়ী প্রকাশন ও আকাশ প্রকাশনী। গ্রন্থটি প্রকাশে এসিস্ট বাংলাদেশকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা ও দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন চাঁদপুরের কৃতিসন্তান, মুক্তিযোদ্ধা (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব) জনাব নাজমুল আহসান মজুমদার।

বইটির মূল্য: ৫০০/- (পাঁচশত টাকা মাত্র)।

চাঁদপুরের সংগ্রামী মানুষ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনীকে রুখে দিয়ে মুক্ত করেছে প্রিয় জন্মভূমিকে। ৮ ডিসেম্বর মুক্তির চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছাতে চাঁদপুরবাসীকে দিতে হয়ে অনেক মূল্য। হানাদারদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে হাজার হাজার নারী-পুরুষ। তাদের রক্তে লাল হয়েছে মেঘনা আর পদ্মার পানি।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে চাঁদপুর মহকুমা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা-কর্মীরা স্বাধীনতা আন্দোলনে তত্পর হয়ে ওঠে। তাদের উদ্যোগে চাঁদপুর নতুন বাজার বালির মাঠে ও বর্তমান সরকারি মহিলা কলেজে বিধিহল মাঠে কাঠের রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়।  ১৭ মার্চ চাঁদপুরে ৩০ জন ছাত্র, কৃষক, ছুটি ভোগরত সেনা সদস্যদের নিয়ে একটি গেরিলা দল গঠিত হয়।

প্রতিরোধ
২৫ মার্চ কাল রাতের পর পাক-হানাদার বাহিনী প্রতিরোধে যুবক ছেলেরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে লাঠিসোঁটা নিয়ে রাতভর পাহারা দিতে থাকে এবং বোমা বানাতে থাকে। এই স্বেচ্ছাসেবকরা চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের বহু সেতুর দু’পাশে মাটি কেটে বড় বড় বাংকার সৃষ্টি করে। যাতে পাক-সেনাদের গাড়ির বহর চাঁদপুর শহরে ঢুকতে না পারে।

চাঁদপুরের প্রথম চার শহীদ
৩ এপ্রিল দুপুরে চাঁদপুর শহরের নতুন বাজারস্থ ট্রাক রোডের পাশে পোদ্দার বাড়ির একটি টিনের ঘরে বসে বোমা তৈরি করছিল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র। হঠাত্ একটি বোমা হাত থেকে পড়ে বিস্ফোরিত হলে শহীদ হন কালাম, খালেক, সুশীল ও সংকর নামে ৪ যুবক ও আহত হয় আরো তিনজন।
৭ এপ্রিল সকাল থেকে পাক-বাহিনীর দু’টি জঙ্গি বিমান চাঁদপুর শহরের নতুন বাজার ও পুরান বাজারে অবিরাম শেলিং শুরু করে। এতে বড় স্টেশনের নিকট এক নারী নিহত হন এবং নতুন বাজার ও পুরান বাজারের প্রায় দেড়শ’ লোক বুলেট বিদ্ধ হয়ে আহত হন। ৮ এপ্রিল বিকালে হানাদার বাহিনীর ৫শ’ সৈন্যের একটি অস্ত্রসহ বহর চাঁদপুর শহরে প্রবেশ করে। তারা চাঁদপুর শহরের ষোলঘর টেকনিক্যাল স্কুলে আশ্রয় নেয় এবং পাক-সেনা অফিসাররা আশ্রয় নেয় ওয়াবদা রেস্ট হাউজে। পরদিন কারফিউর মাঝে বের হওয়ার অজুহাতে আপাক ও মাখন লাল নামে দু’যুবকসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যা করে।

৪৮টি যুদ্ধ
চাঁদপুর অঞ্চলে মোট ৪৮টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে চিতশী যুদ্ধ, সাহেব বাজার যুদ্ধ, মেঘনাবাদী অপারেশন যুদ্ধ, রূপসা বাজার যুদ্ধ, গাজীপুর লঞ্চ আক্রমণ যুদ্ধ, মিরপুর যুদ্ধ, খাজুরিয়া যুদ্ধ, বদরপুর-গাব্দেরগাঁও যুদ্ধ, শোল্লা ও চরশোলাদি যুদ্ধ ইত্যাদি।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চাঁদপুর জেলায় ৯ মাসে জেলার ৭টি উপজেলায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন।

বধ্যভূমি/ গণকবর
চাঁদপুর জেলায় বাগাদী, ছোট সুন্দর, বাবুরহাট, ফরিদগঞ্জ আহম্মদ নগর, সাচার, রায়শ্রী, গৃদকালিন্দিয়া, চরবাগল, দত্ররা, রঘুনাথপুরসহ ১৩টি এলাকায় বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করা হয়েছে।

বন্দীশিবির
এই জেলা পাক-হানাদার বাহিনীর বন্দিশিবির হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, চাঁদপুর রেলওয়ে স্টেশনের মূল হেড অর্থাৎ মেঘনা পদ্মা নদীর মোহনা, ফরিদগঞ্জ ডাক বাংলো ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, হাজীগঞ্জ হামিদিয়া জুট মিলস্ ও জুনাব আলী ময়দানের পাশে রাজাকার কমান্ডার বাচ্চুর অফিস ভবন। (বর্তমানে এটি হাজীগঞ্জ সার্কের এএসপির অফিস ভবন হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে)। এ ছাড়া পাক-সেনারা মেঘনা, পদ্মা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় একটি টর্চার সেল স্থাপন করে। এই টর্চার সেলে জিজ্ঞাসাবাদের নামে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে আগত লোকজন যখন যাকে মনে করেছে, তখন তাকেই এই টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা ও ধর্ষণ করে হাত-পা বেঁধে লাশ পদ্মা-মেঘনায় ফেলে দিয়েছে। পাক-হানাদার বাহিনীরা ফরিদগঞ্জ ডাক বাংলো ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস হামিদিয়া জুট মিলস্ এবং জুনাব আলী ময়দানের পাশে একটি ছোট একতলা ভবনে টর্চার সেল গঠন করে সেখানে বহু নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে।

যেভাবে মুক্ত হলো
২৩ মাউন্টেন্ট ব্রিগেডের মিত্র বাহিনী ও সংযুক্ত বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার দক্ষিণাংশসহ চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, চিতশী, শাহরাস্তি, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর ও কুমিল্লা জেলার সেনানিবাস হানাদার মুক্ত করে। এই কোম্পানির দায়িত্বে ছিলেন মেজর এস.পি ভট্টাচার্য। কোম্পানিটি ৪টি প্লাটুনে বিভক্ত ছিল। প্রথম প্লাটুনের দায়িত্বে ছিলেন সার্জন অব. আহম্মদ (ময়মনসিংহ), দ্বিতীয় প্লাটুনের দায়িত্বে ছিলেন কর্পোরাল (অব.) মোজাম্মেল (সন্দ্বীপ), তৃতীয় চতুর্থ দায়িত্বে ছিলেন মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) মাহমুদ উল্লাহ (সন্দ্বীপ), সিনিয়র টেগ (অব.) জয়নাল আবেদীন (চাঁদপুর)।

সম্মিলিত বাহিনী ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুরের মহামায়া, চাঁদখাঁরপুল ও বাবুরহাট অঞ্চল হতে চাঁদপুর শহরে পাক-বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পাক-বাহিনী চাঁদপুর শহর ছেড়ে রাতে ঢাকায় পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে জাহাজযোগে রওয়ানা হয়। কিন্তু মেঘনা নদীর বক্ষে সম্মিলিত বাহিনীর বিমান ও কামান আক্রমণে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। এতে প্রায় ৫শ’ পাক সেনা ও রাজাকার মেঘনা বক্ষে মারা যায়। অপরদিকে চাঁদপুরের ইচলীঘাট এলাকায় কয়েকশ’ পাক সেনা সম্মিলিত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *